লোকরঞ্জনবাদ ও সন্ত্রাস

0
3991

নোয়াম চমস্কি একজন দার্শনিক, সামাজিক সমালোচক, রাজনৈতিক কর্মী ও অগ্রগণ্য ভাষাতাত্ত্বিক। ১৯৫৫ সাল থেকে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে অধ্যাপকের দায়িত্ব পালন করেছেন। চমস্কি কয়েক ডজন বই লিখেছেন, তার সর্বশেষ বই ‘হু রুলজ দ্য ওয়ার্ল্ড’ ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয়েছে। চমস্কি পাশ্চাত্যের রাজনীতি নিয়ে তাঁর ভাবনা ও তাঁর মতে এটি যে ইস্যুগুলোকে যথাযথভাবে  চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছে সেই বিষয়ে হার্ভার্ড ইন্টারন্যাশনাল রিভিউয়ের সম্পাদক কেনেথ পালমার ও রিচার্ড ইয়েরো-র সাথে আলোচনা করেছেন।  সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন ইমন রায়

যুক্তরাজ্য ও কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠিত গণভোট এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় আরোহণের মধ্য দিয়ে লোকরঞ্জনবাদী (populist) ভাবাবেগের যে উত্থানের চিত্র দেখা গেছে, তার উৎস হিসেবে আপনি কোনটিকে বিবেচনা করেন? এসব ঘটনার ক্রমবিকাশের মধ্যে আপনি কি কোনো সাধারণ সূত্র দেখতে পান?

চমস্কিঃ কলম্বিয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা, তবে ইউরোপ ও আমেরিকায় যা ঘটে চলেছে তার মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। আমি মনে করি, এটি মূলগতভাবে পূর্ববর্তী প্রজন্মের নতুন উদারপন্থী কার্যক্রমসমূহকে নির্দেশ করে যেগুলো এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে এক পাশে ঠেলে দিয়েছে। এই কার্যক্রমসমূহের ফলে কর্পোরেট মুনাফার উন্নতি হয়েছে, মজুরি স্থির হয়েছে এবং সম্পদ ও ক্ষমতা প্রচণ্ডভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ইউরোপে প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর মানুষের কোনো বিশ্বাস ও আস্থা নেই— এটা আসলে [মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের] চেয়েও খারাপ। সিদ্ধান্তগুলো মূলত ব্রাসেলসে নেওয়া হয়; মানুষ যাকে পছন্দ করে তাকে নির্বাচিত করতে পারে, কিন্তু নীতি প্রণয়নে [ইউরোপীয় ইউনিয়নের] কোনো তাৎপর্য নেই। [কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ] জো স্টিগলিৎজ যেমন ইঙ্গিত করেছেন, এটা আদতে এক ডলার, এক ভোট, এবং সবকিছুর প্রতি ক্ষোভটাই হচ্ছে অন্যতম প্রতিক্রিয়া।

তাই উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্রেক্সিট ইংল্যান্ডের বি-শিল্পায়নে থ্যাচারীয় কার্যক্রমের সাথে সম্পর্কযুক্ত। আর্থিক কারসাজির ফলে দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ড সমৃদ্ধিশালী হয়েছে এবং বাকিদের লাভের খাতায় হয়েছে শুধু ফাঁকি। মানুষ এটা নিয়ে রাগান্বিত কিন্তু আমার মতে, তারা একটি যুক্তিহীন উত্তর বেছে নিয়েছে। কারণ ইউরোপ ত্যাগ করলে কোনো কাজের কাজ হবে না— থ্যাচার, মেজর, ব্লেয়ার, কিংবা ক্যামেরন এদের কাউকেই ইউরোপ নির্বাচিত করেনি। আমার ধারণা হলো, ব্রেক্সিটের ফলে এই অবস্থার আরও অবনতি ঘটবে, তবে আপনি এই ক্ষোভের উৎস পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। মহাদেশীয় ইউরোপেও এটি অনেকটা একই রকমঃ ব্যয় সংকোচন কার্যক্রমগুলো মারাত্মকভাবে অর্থনীতির ক্ষতি করেছে, তবে এগুলো আবশ্যকভাবে গণতান্ত্রিক কর্মপন্থার ক্ষতিসাধন করেছে। মধ্যপন্থী দলগুলো ভেঙ্গে পড়ছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের কোনো বিশ্বাস নেই। এগুলো আপনি ট্রাম্প ও স্যান্ডার্স উভয়ের কার্যকলাপে দেখে থাকবেন— জনগণের উন্নয়নের জন্য [একদা বিরাজমান] যে নীতিগুলো কার্যরত ছিলো তার ভাঙনের প্রতি ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।

ব্যয় সংকোচন কার্যক্রমগুলো মারাত্মকভাবে অর্থনীতির ক্ষতি করেছে, তবে এগুলো আবশ্যকভাবে গণতান্ত্রিক কর্মপন্থার ক্ষতিসাধন করেছে।
ব্যয় সংকোচন কার্যক্রমগুলো মারাত্মকভাবে অর্থনীতির ক্ষতি করেছে, তবে এগুলো আবশ্যকভাবে গণতান্ত্রিক কর্মপন্থার ক্ষতিসাধন করেছে।

ট্রাম্পের সমর্থকরা আবশ্যকভাবে খুব দরিদ্র নয়— তাদের অনেকেই পরিমিতরূপে স্বচ্ছল, তাদের চাকরি আছে। তবে যে চিত্রটি ব্যবহার করা হয়েছে সেটা আমার কাছে খারাপ কিছু নয়, তা হলো এই মানুষগুলো একটি লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা কঠোর পরিশ্রম করেছে, তারা লাইনে তাদের “স্থান” করে নিয়েছে এবং তারা এক জায়গাতেই আটকে আছে। তাদের সামনের লোকগুলো অন্তরীক্ষের দিকে এগিয়ে চলেছে এবং তারা মনে করে যে, ফেডারেল সরকার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোকে ঠেলে সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। [তাদের মতে] ফেডারেল সরকার সেটাই করে থাকে— সরকার তাদের পেছনে থাকা লোকগুলো এবং যারা তাদের মতো যথেষ্ট কঠোর পরিশ্রম করেনি সেসব লোকদের তুলে নেয় এবং কতিপয় সহায়তামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, তারা রেডিও শুনে এবং সিরিয়ান অভিবাসীদের কীভাবে রাজার হালে রাখা হয় সে সম্বন্ধে বিলাপ শুনতে শুনতে ভাবে “আমি আমার সন্তানদের কলেজে দিতে পারছি না।”

সম্প্রতি অর্থনীতিবিদ অ্যান কেইস ও অ্যাঙ্গুশ ডিটন শনাক্ত করেছেন যে প্রায়শই মাদকের অপব্যবহার ও আত্মহত্যার দরুণ আয়ুষ্কালের লক্ষণীয় অবনতি হয়েছে এবং শ্বেতাঙ্গ মধ্যবয়সী আমেরিকানদের মধ্যে মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পেয়েছে। মৃত্যুর হারের পরিবর্তন কীভাবে আমেরিকান সংস্কৃতি কিংবা সমাজকে প্রভাবিত করে আসছে বলে আপনি মনে করেন?  

চমস্কিঃ এটা অন্যভাবে বলা যায়, আমি মনে করি আমেরিকার সংস্কৃতি ও সমাজের পরিবর্তনগুলোর কারণে মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি যে ধরনের মানুষের কথা বলছিলাম এরা ঠিক তেমনই, অধিকাংশই শ্বেতাঙ্গ ও অধিকাংশই পুরুষ, যারা তাদের জীবনের কর্মক্ষম সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যারা স্পষ্টতই হতাশা, মর্যাদাহীনতা, যেকোনো ধরনের আত্মসম্মানবোধের ঘাটতিতে ভুগছে, আর মাদক ও মদ্যপানের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ১৯৯০ এর দশকে বাজার সংস্কারের সময় রাশিয়াতে অনেকটা একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিলো। মৃত্যুর হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিলো, এবং সম্ভবত দশ লক্ষাধিক মানুষ মারা গিয়েছিলো। আর অনেক কিছু একই অর্থে ঘটেছিলো যে “সবকিছু ভেঙ্গে পড়ছে, আমাদের আর কিছু নেই, আমি মৃত্যু পর্যন্ত শুধু পান করে যাবো।”

আপনি কি মনে করেন মৃত্যুহারের পরিবর্তন আবশ্যকভাবে রাজনীতির পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত— অর্থাৎ এসব কিছুই একটি অভিন্ন প্রপঞ্চের অংশ?

চমস্কিঃ আমার মনে হয় এটা তারই প্রতিফলন। অন্যভাবে দেখলে এর সাথে ব্রেক্সিট ভোটের মিল খুব বেশি। সেটা হলো, “আমার কোনো পথ খোলা নেই, তাই আমি চিৎকার করবো।” এটা একেবারে অন্যরকম হতো যদি জনগণকে চালিত করার মতো কোনো সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলন থাকতো। ১৯৩০ এর দশকে পরিস্থিতি বাস্তবিক অর্থে অনেক বেশি খারাপ ছিলো, তবুও এক প্রকার আশাবাদের অনুভূতি ছিলো। এই বুড়ো বয়সে আমার স্মরণে আসছে— সশস্ত্র শ্রমিক কার্যক্রম, কংগ্রেস অফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্গানাইজেশনস (সিআইও) গঠন, বামপন্থী দলগুলো ছিলো, আর তুলনামূলকভাবে একটি সহানুভূতিশীল প্রশাসন ছিলো, আর তাই আমরা এটা থেকে কোনো একভাবে বের হয়ে আসছিলাম। আর এখন মানুষের সেটি নেই। এটি একটি লক্ষণীয় তফাত।

আপনি ড্রোনের ব্যবহার নিয়ে অনেক কথা বলেছেন এবং বিশেষত ওবামা প্রশাসনের সময় এর ব্যবহার নিয়ে সমালোচনা করেছেন। আপনি কি কখনো কোনো পরিস্থিতিতে ড্রোন আক্রমণকে সমর্থনযোগ্য মনে করেন? নৈতিক চরমসীমায় পৌঁছুতে গেলে কোন ব্যাপারটি অবশ্যই থাকতে হবে?

চমস্কিঃ উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অতি সম্প্রতি বিস্ফোরকসমেত আইসিস-এর একটি ড্রোনকে প্রতিহত করা হয়েছে। এটা কি ন্যায়সঙ্গত হয়েছে? যুদ্ধকালীন সময়ে [ড্রোন উৎক্ষেপকগুলো] আক্রমণের মুখে থাকার কারণে সেগুলো আত্মরক্ষার নিমিত্তে একটি অস্ত্র ব্যবহার করছিলো। আমি এটা অনুমোদন করি না কারণ আমি সেগুলোও অনুমোদন করি না, তবে সে রকম পরিস্থিতিতে আমি মনে করি আপনি যুক্তি দেখাতে পারেন এটা অন্য যেকোনো ধরনের অস্ত্রের মতোই। অন্য দিকে, এটি যখন সন্দেহভাজনকে গোপনে হত্যা করার একটি পদ্ধতি তখন সেটি একটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। আমি বুঝাতে চাচ্ছি যে এখানে ড্রোনের প্রশ্ন আসছে না। ধরুন, আমাদের উপর আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছে এমন কয়েকজনকে সন্দেহের ভিত্তিতে গুপ্তহত্যা করার জন্য আমরা ঘাতক প্রেরণ করলাম। এটা কি ন্যায়সঙ্গত হবে? ধরুন, একই জিনিস তারাও আমাদের সাথে করলো— এটা কি ন্যায়সঙ্গত হবে? ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট এবং অন্যান্য প্রধান পত্রিকাগুলো সম্পাদকীয় প্রকাশ করে বলেছে আমাদের কালবিলম্ব না করে ইরানে বোমা হামলা করা উচিত। এখন ইরান যদি এই সম্পাদকদের হত্যা করার করার জন্য কাউকে পাঠাতো তাহলে সেটা কি গ্রহণযোগ্য হতো? তখন আমরা কেমন প্রতিক্রিয়া জানাতাম?

আপনি কি মনে করেন মানবিক ইস্যুর প্রতি ও অধিকতর ভালো উপায়ে ড্রোন ব্যবহারের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মনোভাবের পরিবর্তন হয়েছে?

চমস্কিঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের দিকে তাকান। কোনো বিরতি ছাড়াই আমরা পাঁচশো বছর ধরে যুদ্ধরত অবস্থায় আছি। যারা এখানে বসবাস করতো তাদেরকে বিতাড়িত করা হয়েছে নয়ত নির্মূল করা হয়েছে। এখন আমরা যেটাকে জাতীয় ভূখণ্ড হিসেবে জানি, সেখানে লাগাতার যুদ্ধ এবং বিদ্বেষপূর্ণ, বর্বর যুদ্ধের মাধ্যমে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছিলো। তার অব্যবহিত পরই এটি পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে সম্প্রসারিত হয়েছে। বস্তুত কোনো বিরতি ছাড়া পাঁচশো বছর অতিবাহিত হয়েছে এবং সত্যিকার অর্থেই কর্মপন্থায় খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি।

আপনি কি বৃহত্তর পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখতে পান এবং সেটা কোন উপায়ে? মানবিক ইস্যুর প্রতি মনোভাব কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

চমস্কিঃ কিছু ক্ষেত্রে এটা হয়েছে। ধরুন, নিপীড়নের কথাই আবার বলি। জনগণের মধ্যে পর্যাপ্ত নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ছিলো, যার কারণে এটা এখন আপাতদৃষ্টিতে সেভাবে ব্যবহার করা হয় না যেভাবে বুশের আমলে ব্যবহার করা হতো। অন্য দিকে, আমাদের অতিরঞ্জন করা উচিত হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ সর্বোচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন কারাগারের কথাই ধরুনঃ সেগুলো হলো নিপীড়ন প্রকোষ্ঠ। আমি বুঝাতে চাচ্ছি, কয়েদীরা নির্জন কারাবাসের অধীনে থাকে। এটা অনেক লম্বা সময় ধরে, হয়ত তাদের জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে চলা নিপীড়ন। তাই নিপীড়ন সবসময় চলতে থাকে।

আমার মনে হয় এটা এক ধরনের মৌন স্বীকৃতি যেখানে জনগণকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে রাখা উচিত বলে মনে করা হয়। এটা তাদের জায়গা নয়, তাই তাদেরকে অন্য কিছুতে সরিয়ে দাও।

মনস্তত্ত্ববিদ স্টিভেন পিংকার বলেছেন সময়ের সাথে সাথে সহিংসতা হ্রাসকল্পে উন্নতি সাধনের জন্য  আমরা যুক্তি ও “আমাদের অন্তরের শুভ শক্তি” ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছি। আপনি কি এই বিশ্লেষণের সাথে সহমত পোষণ করেন?

চমস্কিঃ কিছুটা তো হয়েছে, তবে তিনি যে চিত্র উপস্থাপন করেছেন তা অনেকটা নড়বড়ে। আমি বলতে চাই, মানুষের প্রায় পচানব্বই শতাংশ ইতিহাসই শিকারী-সংগ্রহকারী সমাজের ইতিহাস। তিনি দাবি করেন যে তারা বর্বর ও সহিংস ছিলো, কিন্তু এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা তাঁর সাথে একমত নন। আদিবাসী সমাজের উপর কয়েকজন নেতৃস্থানীয় লোক করেছেন যেমন ব্রায়ান ফার্গুসন, ডগলাস ফ্রাই, স্টিফেন কোরি প্রমুখ— [শিকারী-সংগ্রহকারীদের সম্বন্ধে পিংকারের ধারণাকে] সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। বৃহৎ পরিসরের হত্যাকাণ্ডগুলো শহর ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার উৎপত্তির সাথে জড়িত। [পিংকারের] একটি শক্তিশালী যুক্তির মূলে রয়েছে “গণতান্ত্রিক শান্তি”, অর্থাৎ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলো একে অন্যের সাথে লড়াই করে না। এর সপক্ষে প্রায় সকল প্রমাণাদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়কাল থেকে নেওয়া হয়েছে, তবে এই সময়ে অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলোও একে অন্যের সাথে লড়াই করেনি। রাশিয়া ও চীন বস্তুত যুদ্ধোন্মুখ থাকলেও কখনোই যুদ্ধে লিপ্ত হয়নি। তারা গণতন্ত্র নয়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াও কখনো যুদ্ধে জড়ায়নি আর রাশিয়া নিশ্চিতভাবে গণতন্ত্র নয়। ১৯৪৫ সালে যেটা ঘটেছে তা হলো বৃহৎ শক্তিগুলো অথবা মোটামুটি মাত্রার শক্তিগুলো বুঝতে পেরেছিলো যে আপনি আর যুদ্ধে যেতে পারবেন না। যদি আপনি যান তাহলে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই ইউরোপে কয়েক শতাব্দী ধরে হত্যা ও অভ্যন্তরীন যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তবে ১৯৪৫ সালের পর আর হয়নি কারণ এর পরেরটাই হতো উপসংহার। আমি মনে করি না যে এটি আমাদের অন্তরের শুভ শক্তির বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত দেয়। বস্তুত ১৯৪৫ সাল থেকে বেশিরভাগ যুদ্ধই রপ্তানি করা হয়েছে, আর এগুলোকে  পিংকার যে উপায়ে দেখেন সেদিকে দিকে খেয়াল করলে দেখতে পারবেন যে তিনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীদেরকে দোষারোপ করেছেন। তিনি বলেন, এই যুদ্ধগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় হয়েছে। আমি বলতে চাই, এটা কি ইরাকি ও ভিয়েতনামীদের জন্য হয়েছে?

১৯৯১ সালের পর থেকে রাশিয়ার ভীতি নেই, তাহলে ন্যাটো থাকার মানে কী?
১৯৯১ সালের পর থেকে রাশিয়ার ভীতি নেই, তাহলে ন্যাটো থাকার মানে কী?

আজকাল যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে না এমন কোন ইস্যুকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়?
চমস্কিঃ আচ্ছা, দুটো বড় ইস্যু আছে, যার কোনোটা নিয়েই যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে না। একটা হচ্ছে সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ও খুবই গুরুতর হুমকি, বিশেষ করে রাশিয়ার সীমান্তে। অন্যটি হচ্ছে পরিবেশগত দুর্যোগ, যেটা আমাদের দিকে খুব দ্রুত ধেয়ে আসছে এবং এটা নিয়ে তেমন কিছুই করা হয়নি। এগুলো আসলেই প্রজাতির টিকে থাকার ইস্যু, মানুষের ইতিহাসে এই পর্যন্ত যা কিছু লেখা হয়েছে তার চেয়েও বেশি কিছু। যেমন [সর্বশেষ মার্কিন প্রেন্সিডেন্ট] নির্বাচনী প্রচারণার কথা ধরা যাক। [এই সমস্যা দুটো] নিয়ে কিছুই বলা হয়নি, যেটা খুবই আশ্চর্যজনক। আমরা মানব ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রচারণা দেখতে পাচ্ছি, যেটা ভবিষ্যতের ঘটনাবলী নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি মুখ্য প্রভাব বিস্তার করতে চলেছে। আর মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ইস্যুগুলো উঠে এসেছে সেগুলো নিয়ে একেবারেই আলোচনা হচ্ছে না। আমরা আলোচনা করছি ট্রাম্পের রাত তিনটার টুইট নিয়ে এবং “হিলারি কি তাঁর ইমেইলে মিথ্যা বলেছেন?” এই জাতীয় বিষয় নিয়ে।

এই ইস্যুগুলো কেন আরও বিশদভাবে আলোচিত হচ্ছে না বলে আপনি মনে করেন?

চমস্কিঃ আমার মনে হয় এটা এক ধরনের মৌন স্বীকৃতি যেখানে জনগণকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে রাখা উচিত বলে মনে করা হয়। এটা তাদের জায়গা নয়, তাই তাদেরকে অন্য কিছুতে সরিয়ে দাও। এটা হতে পারে ভোগবাদ, এটা হতে পারে নারীর প্রতি কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, যেকোনো কিছুই হতে পারে কিন্তু এগুলো প্রধান ইস্যু নয়। আমি মনে করি না যে এটি একটি সচেতন পছন্দ, তবে বিশ্ব যেভাবে চলার কথা সেই বিষয়ে একটি অবচেতন, অভিজাত স্বীকৃতির মধ্যে এটি একভাবে অন্তর্নিহিত থাকে।

পারমাণবিক হুমকি ও পরিবেশগত হুমকির মতো ইস্যুর ক্ষেত্রেও কি এটা প্রযোজ্য?

চমস্কিঃ আপনি যদি পারমাণবিক হুমকির দিকে দৃষ্টিপাত করেন তাহলে আপনার নিজেকে অনেক প্রশ্ন করতে হবে যেগুলো হয়ত আড়ালে রাখাই শ্রেয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ন্যাটো কেন পূর্ব দিকে বিস্তৃত হয়েছে? আদতে ন্যাটো কেন টিকে আছে? রাশিয়ানদের বিপক্ষে একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে ন্যাটোর থাকার কথা ছিলো। ১৯৯১ সালের পর থেকে রাশিয়ার ভীতি নেই, তাহলে ন্যাটো থাকার মানে কী? এমন আরও অনেক গুরুতর প্রশ্ন আছে এবং অবশ্যই ব্যাপারটা এমন নয় যে এগুলো নিয়ে মোটেই আলোচনা হয়নি। এগুলো নিয়ে গবেষণা হয়েছে, তবে সেটা মূলধারার অংশ নয়। আমরা এটা নিয়ে যেভাবে কথা বলি তার মাধ্যমে রাশিয়াকে কেবল অপদস্থ করা হয়,আর রাশিয়া অনেক জঘন্য ব্যাপার ঘটিয়েছে। তবে সেখানে অন্যান্য প্রশ্নও আছে।

Imon Profile Web 01

অনুবাদকঃ ইমন রায় ইলেক্ট্রনিকস এন্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং এ গ্র‍্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। অনুবাদ তার নেশা। সমালোচনামূলক কাজ অনুবাদ করতে ভালবাসেন।

Please follow and like us:
Download PDF

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here