বি সি এস ম্যানিয়া কেন? সমাজ বাস্তবতার নিরিক্ষে

0
717

এক

একজন দিগ্ববিজয়ী সেনানায়ক নেপোলিয়ান বোনাপার্টের একটি বিখ্যাত উক্তি উদ্ধৃত করে লেখাটা শুরু করছি। নেপোলিয়ান বলেছিলেন, “ গিভ মি এন এডুকেটেড মাদার এন্ড আই ইউল গিভ ইউ এন এডু্কেটেড নেশন”। অর্থাৎ আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।

স্বাধীন সার্বভৌম জাতি হিসেবে আমাদের ৪৫ বছরের পথ চলা। ২৪ বছরের পাকিস্তানী শাসন আমাদেরকে অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সর্বক্ষেত্রেই পঙ্গু করে দিয়ে গেছে। দেশ স্বাধীনের পর পরই তাই আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল অনেকগুলো। কিন্তু শিক্ষা দীক্ষায় আমরা ছিলাম অনেক অনেক বেশী অনগ্রসর। ১৯৭১ সালের জরীপ বলছে, তখন নারী পুরুষ নির্বিশেষে এদেশে গড় স্বাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ১৮ শতাংশ। নারীদের ক্ষেত্রে এই অংশটা ছিল মাত্র ১১ শতাংশ আহমেদ,২০০৩)। বর্তমান সময়ে চিত্রটা বেশ বদলে গেছে। ৫৩.৪ শতাংশ নারী বর্তমানে শিক্ষিত বলে বিভিন্ন জরিপ বলছে (২০১৬ সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক এবং অন্যান্য উৎস)।

কিন্তু অনেক কিছুই বদলায়নি। বদলায়নি শিক্ষার উদ্দেশ্য। বদলায়নি পরিবারের ভেতরে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার বাজারজাত উদ্দেশ্য । আর তাই ,“ নলেজ/ এডুকেশন হ্যাস বিকাম কমডিটি” ( লিওটারড)। আর তাই আমি মনে করি, শিক্ষার এই কমডিফিকেশনের পেছনে বর্তমান বাজার ব্যবস্থার পাশাপাশি আমাদের নিম্নবিত্ত্ব পরিবারের অর্ধ শিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত মা এবং বাবারাই অনেকাংশে দায়ী। কেননা , নিম্নবিত্ত্ব, মধ্ববিত্ত্ব পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়া করানোর পেছনে বাবা মায়ের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে পূর্বেকার অর্থনৈতিক টানা পোড়েন থেকে মুক্তি লাভ।

চলুন একটা গল্প শুনে আসি–

“ রাহুল, নিম্ন মধ্যবিত্ত্ব পরিবারে বেড়ে ওঠা শিক্ষিত বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। রাহুলের মা অর্থনীতিতে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর। রাহুলের নানার ইচ্ছে ছিল, মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে ম্যাজিস্ট্রেড বানাবে। কিন্তু হটাত করেই রাহুলের নানা মারা যায়। প্রতিকুল পরিবেশের কারণে রাহুলের বাবার সাথে রাহুলের মায়ের বিয়ে হয়ে যায়। রাহুলের মায়ের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়।

এইদিকে রাহুলের বাবার ও সংগ্রামী জীবন। দশ বছর বয়সে সে তার বাবাকে হারায়। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ার কারণেই এত অল্প বয়সে সংসারের হাল ধরতে হয় তাকে। ফলে আর স্কুলে যাওয়া হয়ে ওঠে না তার। অসম্ভব মেধাবী রাহুলের বাবা স্কুলে না গিয়ে ও এস এস সি তে ৪ টি লেটার সহ মানবিক বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে পাশ করে। অতঃপর সম্মানের সাথে প্রথম শ্রেণী পেয়ে কলেজের চৌকাঠ পার করতে পারলে ও আর লেখাপড়া করা হয়ে ওঠে না তার। এভাবেই রাহুলের বাবার ও ম্যাজিস্ট্রেড হওয়ার স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়।

কিন্তু জীবন তো আর থেমে থাকে না। মানুষ পুনঃশ্চ স্বপ্ন নির্মাণ করতে থাকে।

আর তাই তাদের ভরসার স্থল হয়ে ওঠে রাহুল। জীবনের সর্বস্ব দিয়ে তারা রাহুলকে মানুষ করতে থাকে। রাহুল ও তাদেরকে নিরাশ করে না। স্কুল,কলেজ সর্বত্র সাফল্যের ছোঁয়া রেখে সে ভর্তি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই শুরুতেই তাকে হোঁচট খেতে হয়। দিনরাত অনেক চেষ্টা করে ও  বিভাগীয় ফলাফল আশানুরূপ করতে পারে  না রাহুল। হতাশা শুরু হয়ে যায়। কি করবে তা নিয়ে সবসময় দিশেহারা থাকে। এমন সময় তাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসে সদ্য বিসিএস পাস করা তার ফুফাতো ভাই সামির। ভাইয়ের পরামর্শক্রমে বাজার থেকে গোটা বিশেক এম পি ৩, প্রফেসরস, সাইফুরস এর বই কিনে আনে সে। তারপর থেকেই রোজ সকাল ৮ টায় ঘুম ভাঙ্গে তার, আর জায়গা হয় সেন্ট্রাল লাইব্রেরীতে। অতপর বাবা মায়ের দেখিয়ে দেওয়া স্বপ্নের উপর ভর করে নিজেকে তৈরি করতে শুরু করে রাহুল। সঙ্গী হিসেবে পেয়ে যায় ক্লাসের রোমান, আরিফ, আরব, সুফল, দিশা সহ আরও অনেককেই। সবাই যেন একই সমাজ বাস্তবতা থেকে উঠে এসেছে। সবার পারিবারিক জীবনের পাওয়া না পাওয়ার গল্পগুলো ও যেন একই রকম ।”

আচ্ছা আমাদের  কি জানতে ইচ্ছে করে না, রাহুলের  কোন স্বপ্ন ছিল কিনা?

রাহুলের ও স্বপ্ন ছিল। ছোট বেলা থেকেই কড়া শাসনে মানুষ হয়ে এসেছে সে। পাঠ্য বইয়ের বাইরে অন্য কোন বই রাহুলের জন্য একদম নিষেধ ই ছিল।  তবু ও রাহুল লুকিয়ে লুকিয়ে জাফর ইকবালের বই পড়ত। আর মনে মনে নিজেকে কখন আইনস্টাইন কিংবা নিউটন ভেবে আনন্দ পেত।  হ্যা রাহুলের বিজ্ঞানী হতে ইচ্ছে করতো, ইচ্ছে করতো মহাকাশের অজানা রহস্যের মধ্যে ডুব সাতার কাটতে। কিন্তু জীবনের রুঢ় বাস্তবতার কাছে রাহুল কে বারবারই হার মানতে হয়েছে।

জীবনের প্রয়োজনে (আনাংকি) নিজের ভাল লাগা/ইচ্ছে অনিচ্ছাকে (ইরোস/লিবিডো) বিসর্জন দিয়ে বাবা মায়ের কিংবা সমাজের দেখানো পথেই হাঁটতে হচ্ছে রাহুলদের।

দুই

এদেশে ব্রিটিশরা শাসন করে গেছে প্রায় দুইশত বছর। তার ও আগে, এদেশে শাসন করেছে ফরাসীরা,পর্তুগীজরা, ডাচরা, তুর্কিরা, মোঘলরা, সেনরা,পালরা। আর তাই এদেশীয় (নেটিভ) হিসেবে শোষিত হয়ে থাকার ইতিহাসই আমাদের দীর্ঘ। সেইকারণেই আমাদের মনোজগতে অন্যের হুকুম পালন করার মানসিকতা দীর্ঘদিনের। আর তাই এই অঞ্চলে অনেকদিন ধরেই“ জী হুজুর, আজ্ঞা হুজুর, ইয়েস স্যার শব্দগুলো” প্রচলিত হয়ে আসছে। স্কুল, কিংবা কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ও এই জী হুজুর গিরি বহাল তবিয়াতেই চলছে। আর তাই নব্য বাংলাদেশের অফিস-আদালত, কল-কারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনীতির মাঠ, খেলার মাঠ কোন কিছুই মুক্ত নয় এই জী হুজুর গিরি থেকে, এই মানসিক দাসত্বের জায়গা থেকে। ফলে আমরা সহস্র আমলা পেয়েছি, পেয়েছি কোটি কোটি শ্রমিক, রাজনীতির মানুষ, চটি কবি। শুধু পাই নি একজন আইন্সটাইন, কিংবা সত্যেন বোস, পাইনি একজন বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্রনাথ, কিংবা নজরুল, কিংবা একজন আব্দুর রাজ্জাক স্যারকে।

তিন

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সভ্যতা নাকি আমেরিকান সভ্যতা, ইউরোপীয় সভ্যতা, কিংবা চৈনিক সভ্যতা। অথচ সভ্যতার সূচনা হয়েছিল আমাদের এই ভারতবর্ষেই কিংবা আশেপাশের ভোগলিক মানচিত্রকে ঘিরে- পাকিস্তানে গড়ে উঠেছিল সিন্ধু সভ্যতা, ইরাকে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী সভ্যতা ( ৩৫০০ খ্রিষ্টপূর্ব)। আর তাই একটা প্রবাদ বাক্য আমরা সবাই কমবেশি জানি, “ আমাদের গোলা ভরা ধান ছিল, পুকুর ভরা মাছ ছিল”। উইটফোগেল ও আমাদের এই সভ্যতাকে বলেছিল “ হাইড্রোলিক সোসাইটি”. আর অনেক সমাজতাত্ত্বিক কিংবা ইতিহাসবিদ আমাদের “ স্বয়ং সম্পূর্ণ গ্রামীণ সমাজ” ছিল বলে তাদের লেখায় উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এত কিছু থাকা সত্ত্বে ও আমাদের আজ এই রুগ্ন অবস্থা কেন?

যে সময়ে আমাদের এই ভারতবর্ষের সম্পদ লুন্থন করে ইউরোপিয়ানরা কলকারখানা, বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় লাইব্রেরী,অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, হাভারড বিশ্ববিদ্যালয় গড়েছে সেই সময়ে আমরা এক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কিছুই প্রতিষ্ঠা করতে পারি নি। আমরা পয়সা ঢেলেছি বায়জিদের পিছনে, বায়স্কোপ দেখে,বিলেত যেয়ে, কিংবা হুকা টেনে। ফলে এখন আমাদের গোলা আছে, কিন্তু ধান নেই, পুকুর আছে কিন্তু মাছ নেই, কিংবা পুকুর মাছ দুটোর কোনটাই নেই। আর তাই, এই সময়ে এসে অর্থনৈতিক মুক্তিই যেন আমাদের একমাত্র চাওয়া। সেখানে আছে জীবিকার জন্য জীবিকা, নেই জীবনের জন্য জীবিকা। ফলে মার্ক্সের অর্থনৈতিক মুক্তি আর স্পেন্সারের  “সারভাইভাল অফ দি ফিটেস্ট” নীতিই আমাদের জীবনের একমাত্র ইথোস। ফলে জ্ঞান হয়ে আসছে উপেক্ষিত, বিসিএসের বাজার তাই রমরমা।

চতুর্থ

এদেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অতিরিক্ত বিসিএস নির্ভরশীলতাকে আমাদের কাছে বেমানান বলে মনে হয় । কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে আমার কাছে এই বিসিএস ম্যানিয়াকে রেশনাল মনে হয়। বেবারের রেশনাল চয়েজের জায়গা থেকে দেখলে, বর্তমান সময়ে এদেশে বি সি এসের চাইতে ভাল কোন কিছু আছে বলে আমি দেখতে পাই না। এদেশে সর্বত্র বিসিএস এর চাকরীকে যেভাবে প্রমোট করা হয়ে আসছে, সেইভাবে আর কোন সেক্টর কেই প্রমোট করা হয়ে আসছে না । বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে গবেষণা করার জন্য নেই কোন বরাদ্দ।যত সামান্য যা আছে তা দিয়ে এই যুগে হয়তো এক কাপ চায়ের খরচ চলে, কিন্তু গবেষণার কথা চিন্তা ও করা যায় না।

আর তাই এদেশে একটা ক্যাল্ভারট, ব্রীজ, সেতু, ফ্লাইওভার নির্মাণ করতে গেলে ও বিদেশী স্থাপত্য শৈলীদের দ্বারস্থ হতে হয় আমাদের।সামান্য বুকের ব্যথার চিকিৎসা করানোর জন্য যেতে হয় প্রতিবেশী দেশ ভারতে, মালয়শিয়া কিংবা সিঙ্গাপুরে। এসমস্ত কিছুই এ জাতির ভাগ্যাকাশে অশনি সংকেত  এবং বিসি এস ম্যানিয়াকে চিত্রিত করে।

সবশেষে

সুতরাং রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে সর্বাঙ্গে। জং ধরা, ঘুনে ধরা শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে, সৃজনশীল নামক অসৃজনশীল কাঠাম ব্যবস্থা থেকে মুক্তি দিতে হবে স্কুল কলেজের বাচ্চাদেরকে।  পাড়ায় পাড়ায়, প্রত্যেক মহল্লাতে অসংখ্য লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করতে হবে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে কারাগারে পাঠাতে হবে। শিক্ষিত বেকারদের জন্য উন্নত বিশ্বের মত বেকার ভাতা দিতে হবে, যেন তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছান পর্যন্ত অর্থনৈতিক টানাপড়েন থেকে মুক্ত থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুণগত পঠন পাঠন এবং পর্যাপ্ত গবেষণার ব্যবস্থা করতে হবে। আর যোগ্যদের যোগ্যতম স্থানে বসাতে হবে। তাহলেই, আমি মনে করি, একটি জ্ঞান ভিত্তিক সমাজ নির্মাণ সম্ভব, সম্ভব বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়া।

 

শামসুল আরেফিন (রেহান)

সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

তারিখ- ২৪/০৮/২০১৬

 

 

 

Please follow and like us:
Download PDF

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here