সোভিয়েত ইউনিয়ন কেন জার্মানির সাথে অনাক্রমণ চুক্তি করেছিলো?

0
2898
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও নাৎসী জার্মানির মধ্যকার অনাক্রমণ চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৩৯ সালের ২৩ আগস্ট নাৎসী জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রী জোয়াকিম ভন রিবেনট্রপ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ভি. এম মলোটোভ মস্কোতে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। অনাক্রমণ চুক্তিটি ছিলো মূলত একটি নিরপেক্ষতামূলক চুক্তি, যার বলে দুটি রাষ্ট্র একে অন্যকে আক্রমণ না করার জন্য সম্মত হয়েছিলো। প্রশ্ন জাগে, যে সোভিয়েত ইউনিয়ন নাৎসীদের প্রতিরোধ ও পরাজিত করতে গিয়ে সর্বাধিক সামরিক ও মানবিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলো, তারা কেন এই অনাক্রমণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলো? স্টালিন কি সত্যিই হিটলারকে তোষণ করেছিলেন যেমনটা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর ঐতিহাসিক বয়ানে উল্লেখ করা হয়? নাকি হিটলারের অপ্রতিরোধ্য গতিকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য এই অনাক্রমণ চুক্তি করা ছাড়া আর গত্যন্তর ছিলো না?

 

এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদেরকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। সত্যের কাছাকাছি যেতে হলে চুক্তিটির কার্যকারণ সম্বন্ধের প্রতি আমাদের আলোকপাত করা আবশ্যক। মার্কিন সাংবাদিক আনা লুইস স্ট্রং তাঁর “দ্য স্টালিন এরা” বইতে চুক্তিটির পূর্বাপর ঘটনাসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি দীর্ঘ দিন রাশিয়ার ‘মস্কো নিউজ’ পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন। সেই সময় তিনি বিপ্লব-পরবর্তী সময়ের সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের বিকাশ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সোভিয়েত কূটনীতি ও রণকৌশল খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন।

 

1

 

১৯১৭ সালের ৮ নভেম্বর তারিখে রাশিয়ার নবগঠিত বিপ্লবী সরকার তার প্রথম সরকারি কাজের ঘোষণা দেয়ঃ “সমস্ত যুদ্ধরত জাতি ও সরকারের কাছে রাজ্যের অন্তর্ভুক্তিকরণ বা ক্ষতিপূরণ ব্যতীত একটা ন্যায়সঙ্গত ও গণতান্ত্রিক শান্তির জন্য অবিলম্বে আলাপ-আলোচনা চালানোর প্রস্তাব করা।” প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার অংশগ্রহণের ফলে দেশটির অর্থনৈতিক দৈন্য-দশা ও খাদ্যাভাব চরমে ওঠে। ফলে রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিলো না। জারতন্ত্রের পতনের পর বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করলে তারা যুদ্ধ বন্ধের জন্য আহ্বান জানায়। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মিত্রশক্তিরা এই দাবি করার জন্য বলশেভিকদের নিন্দা করে। তারা রাশিয়াকে যেভাবেই হোক যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বলে। উপায়ান্তর না দেখে লেনিন জার্মানির সাথে একটি ‘ডাকাতে সন্ধি’ স্থাপন করেন। সে সন্ধির বদৌলতে ইউক্রেন ও বাল্টিক রাজ্যগুলো জার্মানির দখলে চলে আসে।

 

রাশিয়া তখন শান্তি স্থাপনের জন্য এতই উতলা হয়ে পড়ে যে, লেনিন রাশিয়াকে দুই খণ্ড করে ফেলার জন্য প্রায় রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। ১৯১৯ সালের মার্চ মাসে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের আধা-সরকারি দূত উইলিয়াম ক্রিশ্চিয়ান বুলিট মস্কো গিয়ে একটি অভিনব প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, গৃহযুদ্ধে জর্জরিত রাশিয়ার যেসব এলাকা যেসব সরকারের অধীনে আছে, তাদেরকে সেসব অংশ ছেড়ে দিয়ে দেশটিকে ভাগ করে ফেলা হোক। এমনটা বাস্তবায়িত হলে রাশিয়ার সুদূর প্রাচ্যে জাপানিদের প্রভাব-বলয়ের মধ্যে একটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হতো। সেই সাথে ইউক্রেন, ককেশাস, মধ্য এশিয়া ও উত্তর মেরু অঞ্চলের বন্দরগুলোতে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের আধিপত্য স্থাপিত হতো। রাশিয়ায় সেই সময় গৃহযুদ্ধের দরুণ ক্ষুধা ও দারিদ্র্য এতই বেড়ে গিয়েছিলো যে, লেনিন সত্যিকার অর্থে এমন ডাকাতে প্রস্তাবেও রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। মিত্রশক্তিগুলো এতে রাজি হয়নি, তারা চেয়েছিলো বলশেভিকদের শেষ করে দিতে। সেজন্য তারা ভার্সাইয়ের সন্ধি সম্মেলনে বলশেভিকদের সাথে কোনো শান্তি স্থাপন করেনি। অবশেষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি পরাজিত হয়েছিলো। তারপরেও জার্মানি ও বিজয়ী মিত্রপক্ষ উভয়ই আরো দুই বছর রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ করেছিলো।

 

শান্তির জন্য ভূমি ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেও সোভিয়েতরা শান্তি অর্জন করতে পারেনি। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯২০ সালে ফরাসীদের সহায়তায় পোলিশরা সোভিয়েত ইউনিয়নকে সশস্ত্র আক্রমণ করে। ১৯২০-২১ সালে জার্মানি ও মিত্রপক্ষ উভয়ই সোভিয়েত ইউনিয়নকে আক্রমণ করে। ১৯২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ভ্লাদিভোস্টক জাপানের দখলে ছিলো। ১৯৩৩ সালে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের সময়ে আমেরিকা সোভিয়েত ইউনিয়নকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯২২ সালে জেনোয়ায় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রথম বারের মতো সোভিয়েত ইউনিয়ন নবীন রাষ্ট্র হিসেবে যোগ দেয়। সেখানে সোভিয়েতরা অস্ত্র-সংকোচনের বিষয়ে মত দেয়। অন্য দিকে মিত্রপক্ষ জার্মানির পাশাপাশি রাশিয়ার উপরও অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে। সোভিয়েতের আবেদনে মিত্রপক্ষ সাড়া না দেওয়ার কারণে জার্মানির সাথে সোভিয়েত ইউনিয়ন র‍্যাপোলো চুক্তি স্বাক্ষর করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পর্যুদস্ত দুটি রাষ্ট্র ‘সাম্যের ভিত্তি’তে বন্ধুত্ব পুনঃস্থাপন করেছিলো, একে অন্যের ঋণ মওকুফ করেছিলো। এভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধবিধ্বস্ত জার্মানির পুনর্গঠনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভার্সাই চুক্তিকে উস্কানিমূলক মনে করতো এবং চেয়েছিলো যেন জার্মানি চুক্তিটি পুনরালোচনা করার আবেদন জানায়। ভার্সাই চুক্তির শর্তাবলী জার্মানিতে উগ্র জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটিয়ে দেশটিকে ক্রমাগত নাৎসীবাদের দিকে ঠেলে দেয়। মিত্রশক্তিগুলো যদি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর গণতন্ত্র অভিলাষী জার্মানির পুনর্গঠনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতো তাহলে দুনিয়ার ইতিহাস অন্য রকম হলেও হতে পারতো।

 

সোভিয়েত ইউনিয়নের সেই সময়কার পররাষ্ট্র মন্ত্রী ম্যাক্সিম লিৎভিনভ সংক্ষেপে সোভিয়েত পররাষ্ট্র নীতি সম্বন্ধে বলেনঃ “শান্তি অবিভাজ্য।” এই মূলনীতি অনুসরণ করে সোভিয়েত পররাষ্ট্র নীতি পরিচালিত হয়েছিলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে ক্যালোগ চুক্তির প্রস্তাব করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন সেখানে প্রথম স্বাক্ষর করেছিলো। ১৯২৩ সালে খিলাফতের পতনের পর যখন তুরস্ক একটি আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে সোভিয়েতের সমর্থন ছিলো। জারতন্ত্রের পতনের পর ফিনল্যান্ড রাশিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতা প্রার্থনা করলে কেরেনস্কির নেতৃত্বাধীন অন্তঃবর্তীকালীন সরকার তা মঞ্জুর করেনি। এমনকি তৎকালীন জারতন্ত্রের মিত্র হিসেবে পরিচিত আমেরিকা, ফ্রান্স ও ব্রিটেন কেউই ফিনল্যান্ডের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলো না। বলশেভিকরা ক্ষমতায় আসার পর ফিনল্যান্ড রাশিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। জার্মানি ও জাপান ‘লীগ অফ দ্য নেশন্‌স’ থেকে সরে দাঁড়ালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য সমবেত চুক্তি সম্পাদনের উদ্দেশ্যে ‘লীগ অফ দ্য নেশন্‌স’-এ যোগদান করে। নাৎসীদের সমরোন্মুখ উস্কানি ঠেকানোর জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে একতাবদ্ধ করার জন্য বন্ধুত্ব স্থাপন করার প্রচেষ্টা চালায়।

 

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেইন নাৎসীদের তোষণ করতে শুরু করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অদ্যাবধি জার্মানির উপর যেসব কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিলো, নাৎসীদের যুদ্ধোন্মুখ তৎপরতার বেলায় তার ব্যত্যয় ঘটেছিলো। চেম্বারলেইন রাইনল্যান্ডে নাৎসীদের সামরিক ঘাঁটি ও সৈন্য সমাবেশ করতে দিলেন, সার-এ নাৎসীদের সাজানো গণভোট মেনে নিলেন, জার্মানির পুনরায় সামরিকায়ন ও নৌ-বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির ব্যাপারে মৌনতা অবলম্বন করলেন, স্পেনে হিটলার ও মুসোলিনির নাক গলানোর ব্যাপারটিও সয়ে গেলেন। ব্রিটেনের ধনিকগোষ্ঠী আগে অত্যধিক ক্ষতিপূরণের শর্ত দিয়ে জার্মানিকে পঙ্গু করে দিতে চেয়েছিলো। পরে আবার তারা-ই জার্মানিতে অর্থ বিনিয়োগ করে হিটলারের হাতকে শক্তিশালী করার দিকে মনোনিবেশ করলো। এসব বেনিয়াদের কাছে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিলো নাৎসীদের চেয়েও বড় শত্রু। পরবর্তীতে মিউনিখ সম্মেলনে ব্রিটেন ও ফ্রান্স যখন চেকোস্লোভাকিয়াকে নাৎসীদের হাতে তুলে দিয়ে পূর্ব দিকে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে চাইলো, তখন বিষয়টি আরো স্পষ্ট হতে থাকে।

 

নাৎসীরা চেকোস্লোভাকিয়ার সুদেটেনল্যান্ডে জার্মান জাতিগোষ্ঠীর লোকদের উপর কাল্পনিক গণহত্যার অভিযোগ তুলে প্রোপাগান্ডা চালায়। তবে নাৎসীরা সুদেটেনল্যান্ডের উপর জোর দাবি জানানোর আগেই চেম্বারলেইন সেটা তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য আলাপ শুরু করেন। ১৯৩৮ সালের ২৮-২৯ সেপ্টেম্বর মিউনিখে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইতালি হিটলারকে সুদেটেনল্যান্ড দখল করার অনুমতি দিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। চেকরা যখন হিটলারকে প্রতিরোধ করার কথা বিবেচনা করতে শুরু করে, তখন প্রাগস্থ ব্রিটিশ ও ফরাসী রাষ্ট্রদূতরা চেকদের প্রতিরোধ যুদ্ধে সহায়তা করার ব্যাপারে তাদের অপারগতার কথা জানিয়ে দেন। স্পেনে গণতন্ত্রীদের পতনে তারা যেমন মৌনভাব নিয়েছিলো, চেকদের ব্যাপারেও তারা একই অবস্থান নিয়ে ফ্যাসিবাদী শক্তিকে অনুমোদন করলো। নাৎসীরা চেকোস্লোভাকিয়ার ভূমি দখল করার পরে জানা গেলো, তার কয়েক সপ্তাহ আগেই ব্রিটেনের ধনিকগোষ্ঠী জার্মান শিল্পপতিদের সঙ্গে নব-অধিকৃত শিল্পগুলোতে অর্থ বিনিয়োগের জন্য চুক্তি করে রেখেছিলো। নাৎসীদের বিরুদ্ধে চেকদের প্রতিরোধে সোভিয়েতরা তখন সহায়তা করার কথা ভাবছিলো। আনা লুইস স্ট্রং-এর বই থেকে জানা যায়, রাশিয়ার কয়েকজন সামরিক অফিসার চেকদের সাহায্য করার জন্য মস্কোর নির্দেশের অপেক্ষায় ছিলেন। যখন ব্রিটেন ও ফ্রান্সের চাপে যখন চেক প্রেসিডেন্ট বেনেস নতি স্বীকার করলেন, তখন তারা হতাশ হয়েছিলেন। তারা আশংকা করেছিলেন “সে আক্রমণ আসতে পারে পোল্যান্ড অথবা ফ্রান্সের উপর”, যা পরে সত্য প্রমাণিত হয়েছিলো।

 

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেইন ও ফরাসী প্রধানমন্ত্রী দালাদিয়ের চেক সেনাবাহিনীর ২৭টি ডিভিশন ও একটি আত্মরক্ষামূলক দুর্গশ্রেণী নাৎসীদের হাতে ছেড়ে দিলেন। ইউরোপের অন্যতম সেরা অস্ত্র নির্মাণকারী স্কোডা কারখানা তারা নাৎসীদের দিয়ে দিলেন। নির্বুদ্ধিতার জন্য নয় বরং তারা জেনেবুঝেই কাজটি করেছিলেন। আনা তাঁর বইয়ে এক শিল্প-কারখানার ম্যানেজারের কথা উদ্ধৃত করে বলেছেন, “চারটি শব্দে এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায়— ওরা বলশেভিজমকে ভয় পায়।” জার্মানির চেকোস্লোভাকিয়া অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি সোভিয়েত ইউনিয়ন মেনে নেয়নি। জার্মানি যাতে আরো আক্রমণ করতে না পারে সেজন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন চেম্বারলেইনের কাছে ব্রিটেন, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, তুরস্ক ও রাশিয়ার সমন্বয়ে একটি মন্ত্রী পর্যায়ের সভা আহ্বান করে। এখানেও চেম্বারলেইন তাঁর হিরণ্ময় নীরবতা প্রদর্শন করেন। ফ্রান্স ও ব্রিটেনের গড়িমসির সুযোগ নিয়ে হিটলার লিথুনিয়ার প্রধান বন্দর মেমেল অধিকার করেন এবং বাল্টিক সাগরের দিকে পোল্যান্ডের নির্গম পথ ডানজিগের অবস্থা বিপন্ন করে তোলেন। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে পোল্যান্ডের সীমান্ত বরাবর সাতটি জার্মান ডিভিশন পোল্যান্ডের ভিতর প্রবেশ করার জন্য হাই কমান্ডের নির্দেশের জন্য প্রতীক্ষা করছিলো, তখনো “ফরাসী সরকারের সবচেয়ে উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের মতে এ যুদ্ধ বাধার সম্ভাবনা দশটা হলে, না হওয়ার সম্ভাবনা একটা।”

 

ব্রিটেন ও ফ্রান্সের অনেকেই হিটলারের অপ্রতিরোধ্য গতি থামানোর জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে মৈত্রী স্থাপনের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ ও ফ্রান্সের প্রাক্তন বিমান বিভাগীয় মন্ত্রী পিয়ের কৎ-এর মতে, সোভিয়েতের সাথে মৈত্রী স্থাপন করলে হিটলারকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এছাড়া নিউ ইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবিউনে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, শতকরা ৯২ জন লোক সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ত্রিপক্ষীয় মৈত্রী স্থাপনে আগ্রহী। চেম্বারলেন সরকার জনমতকে অগ্রাহ্য করে উলটো হিটলারের সাথে আপোস করতে চাইলেন। ১৯৩৯ সালের ৩ মে চেম্বারলেন হাউজ অফ কমন্সে সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলেন, জার্মানির সাথে অনাক্রমণ চুক্তি করার জন্য ব্রিটেন প্রস্তুত আছে। অথচ এর দুই দিন পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্রিটেনের সাথে মৈত্রী প্রস্তাব করলে তা অগ্রাহ্য করা হয়।

 

ব্রিটেনের রক্ষণশীল দলের সাংসদরা চেম্বারলেইনের পদক্ষেপের সমালোচনায় মুখর হলেন। ৭ মে উইনস্টন চার্চিল হাউজ অফ কমন্সে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে মৈত্রী স্থাপনের পক্ষে তাঁর অবস্থান ব্যক্ত করলেন। ইতোমধ্যে হিটলারের চেকোস্লোভাকিয়া দখলের পর দশ সপ্তাহ চলে গেছে। অগত্যা চাপে পড়ে আরো তিন সপ্তাহ পরে ব্রিটেন সরকার একজন কূটনীতিককে সোভিয়েত সরকারের সাথে আলোচনার জন্য মস্কো প্রেরণ করলেন। মজার ব্যাপার হলো এই কূটনীতিককে কোনো কিছুতে স্বাক্ষর করার কর্তৃত্ব না দিয়ে পাঠানো হয়েছিলো। ৭৫ দিনব্যাপী দুই পক্ষের মধ্যে সংঘটিত আলোচনায় ব্রিটিশ পক্ষ তাদের প্রস্তাব লিখতে ৫৯ দিন অতিবাহিত করলো, অন্য দিকে সোভিয়েত সরকারের এই কাজ করতে লাগলো মাত্র ১৬ দিন। এরই মধ্যে সোভিয়েতরা জানতে পারলো যে, ব্রিটেনের বৈদেশিক বাণিজ্য দপ্তরের পরিষদ সম্পাদক জার্মানির সরকারের সাথে ৫-১০ হাজার কোটি পাউন্ড ঋণের সম্পর্কে আলাপ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এভাবে চেম্বারলেইন সরকার বিভিন্নভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে মৈত্রী স্থাপনের ব্যাপারে অনাগ্রহ প্রদর্শন করে নাৎসীদের আক্রমণাত্মক আচরণকে উৎসাহিত করে গেছেন। সোভিয়েত রাজনীতিকরা বুঝতে পারছিলেন যে, যুদ্ধটাকে ইচ্ছে করেই পূর্ব দিকে চালিত করার জন্য হিটলার ও তার কর্মকাণ্ডের প্রতি সহানুভূতিশীল দোসররা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

৩ মে তারিখে তৎকালীন সোভিয়েত পররাষ্ট্র মন্ত্রী ম্যাক্সিম লিৎভিনভ পদত্যাগ করলেন। আট বছর ধরে মাঞ্চুরিয়ায়, আবিসিনিয়ায়, স্পেনে, চীনে, অস্ট্রিয়ায়, আলবেনিয়ায়, চেকোস্লোভাকিয়ায়, মেমেলে তাঁর শান্তি স্থাপনের নীতি অবশেষে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। লিৎভিনভের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে মস্কো আদতে জানিয়ে দিলো যে, ব্রিটিশ সরকারের সাথে তাদের আলোচনা কোনো ফলাফলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে না। ব্রিটেন ও ফ্রান্স তখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। ২৯ জুলাই উচ্চতম সোভিয়েতের ‘বৈদেশিক ব্যাপার সমিতি’র সভাপতি আন্দ্রে ঝদানভ ‘প্রাভদা’ পত্রিকায় তাঁর শঙ্কার কথা জানিয়ে লিখলেন, ব্রিটেন ও ফ্রান্স কেউই হিটলারকে প্রতিরোধ করার ব্যাপারে আগ্রহী নয়। হিটলার রাশিয়া আক্রমণ না করা পর্যন্ত তারা সোভিয়েতের সাথে আলোচনা চালিয়ে তাদেরকে শান্ত রাখতে চাইছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে ইউরোপের সকল বৈদেশিক দপ্তর থেকে জানা গেলো, হিটলার আর এক মাসের মধ্যে পোলিশ করিডোর দখল করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন। উল্লেখ্য, পূর্ব দিকে জার্মানির প্রুশিয়াকে তার বাকি অংশের সাথে সংযোগ রাখতে হতো এই পোলিশ করিডোরের মাধ্যমে।

 

2

 

হিটলার যখন পোলিশ করিডোর দখল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন সোভিয়েত সরকার ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে অনুরোধ করলেন, তারা যেন পূর্ব ইউরোপের রক্ষণ ব্যবস্থার পরিকল্পনা ঠিক করার জন্য মস্কোতে একটি সামরিক মিশন প্রেরণ করেন। ব্রিটেন ও ফ্রান্স এবার সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রস্তাবে সাড়া দিলো, তবে এখানেও তাদের সদিচ্ছার অভাব দেখা গেলো। সামরিক মিশন দশ দিন পর সোভিয়েতের আহ্বানে সম্মতি জানালো এবং যে পথে মস্কো আসতে সবচেয়ে বেশি সময় লাগে সেই পথ ধরে অবশেষে মস্কো এসে পৌঁছে। পূর্বোল্লিখিত ব্রিটিশ কূটনীতিকের মতো এবারের সামরিক মিশনকেও কোনো কিছুতে সম্মতি জানানোর অধিকার না দিয়ে মস্কোতে পাঠানো হয়েছিলো। সোভিয়েত প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ক্লিমেন্ত ভরোশিলভ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তাকে নিয়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্স কর্তৃক প্রেরিত সামরিক মিশনের সাথে আলোচনায় বসলেন। তিনি প্রস্তাব করলেন, হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন দুটি সৈন্যবাহিনী পাঠাবে। একটি উত্তরে পূর্ব প্রুশিয়ার দিকে যাবে, অন্যটি দক্ষিণ পোল্যান্ডের মধ্য দিয়ে মধ্য জার্মানির দিকে যাবে।

 

ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সামরিক মিশন জানালো, এই ব্যাপারে তারা আগে পোলিশ সরকারের মতামত জানতে চায়। পোলিশ সরকার আবার সোভিয়েতের সাহায্য নিতে আগ্রহী ছিলো না। হিটলারের চেকোস্লোভাকিয়া আক্রমণের সময় ফ্রান্স ও ব্রিটেন চেকদের আত্মসমর্পন করতে বাধ্য করেছিলো, কিন্তু পোল্যান্ডকে হিটলারের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তা নিতে চাপ প্রয়োগ করলো না। ইঙ্গ-ফরাসী মিশনের সাথে সোভিয়েতের আলোচনা ব্যর্থ হলো। ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সাথে মৈত্রী স্থাপনের আরো একটি প্রচেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়লো। ক্লিমেন্ত ভরোশিলভ শেষমেশ বিরক্ত হয়ে এই আলোচনাকে ‘ছ্যাবলামো’ বলে অভিহিত করলেন।

 

যুদ্ধ যখন ক্রমাগত পূর্ব দিকে ধেয়ে আসছে, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন মনস্থির করে ফেললো। ১৯৩৯ সালের ২৩ আগস্ট নাৎসী জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করলো। হিটলার আগেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে অনাক্রমণ চুক্তি করতে চেয়েছিলেন। অতঃপর ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সাথে মৈত্রী জোট করতে ব্যর্থ হওয়ার দরুণ সোভিয়েত ইউনিয়নকে এই অনাক্রমণ চুক্তি করতে হয়েছিলো। ১৯২৬ সাল থেকে জার্মানি ও রাশিয়ার মধ্যে যে নিরপেক্ষ নীতি চলে আসছিলো, হিটলারের ক্ষমতায় আরোহণের পর সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো। অনাক্রমণ চুক্তিটি হলো সেই নিরপেক্ষতা নীতির প্রতি একটি পুনঃসমর্থন। সোভিয়েত পররাষ্ট্র মন্ত্রী ভি.এম. মলোটোভ বলেছিলেন, “(ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সাথে) পারস্পরিক সাহায্য চুক্তি সম্পাদিত হলো না দেখে” সোভিয়েত ইউনিয়ন জার্মানির সাথে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। অনাক্রমণ চুক্তি সম্পাদন করার মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তরে বাল্টিক সাগর থেকে দক্ষিণে কৃষ্ণ সাগর পর্যন্ত পূর্ব ইউরোপ জুড়ে একটি প্রতিরক্ষামূলক বেষ্টনী গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিলো। বুলগেরিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়া এই অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে সক্ষম হলো। তারা ভাবলো, এই চুক্তি হিটলারের পোল্যান্ড আক্রমণ ঠেকাতে না পারলেও যুদ্ধটাকে পূর্ব দিক থেকে আপাতত সরিয়ে নিতে পেরেছে।

 

সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে অনাক্রমণ চুক্তি করায় হিটলারের মিত্ররা ক্ষেপে গেলো। মুসোলিনী ও ফ্রাঙ্কো দুজনেই চুক্তির সমালোচনা করলেন। জাপানও এই চুক্তির বিরোধিতা করলো। জাপান তখনই মঙ্গোলিয়ার সীমান্ত থেকে রাশিয়াকে আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত ছিলো এবং হিটলারকে জানিয়েছিলো যে, আগস্ট মাসে দেশটি রাশিয়াকে ‘প্রচণ্ড ধাক্কায়’ আক্রমণ করতে পারবে। সোভিয়েতের সাথে চুক্তি সম্পাদন নিয়ে হিটলারের প্রতি তীব্র সমালোচনার মাঝে জাপানে মন্ত্রীসভার পতন ঘটলো। ব্রিটেনে হিটলারের পৃষ্ঠপোষকরা এই প্রথম তার কর্মকাণ্ডে রাগান্বিত হয়ে গেলো। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে অনাক্রমণ চুক্তি সম্পাদনের পর ব্রিটিশ সরকারের এবার টনক নড়লো। হিটলার পোল্যান্ডে প্রবেশ করার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেইন পোল্যান্ডের বিষয়ে সমাধানে আসার জন্য দশ দিন যাবত ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইটালির মধ্যে একটি সম্মেলন আয়োজনের চেষ্টা করলেন। সম্মেলন আয়োজনের চেষ্টা ব্যর্থ হবার পর চেম্বারলেইন পোল্যান্ডের সাথে বহুল প্রতীক্ষিত মৈত্রী চুক্তি করে পোলিশদের প্রতিরোধ করতে বললেন।

 

দুই দিনের মধ্যে পোলিশ বিমানবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেলো। দুই সপ্তাহের মধ্যে তাদের সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব রইলো না। পোলিশ সরকার ততক্ষণে রোমানিয়ার কোনো এক জায়গায় সরে গেছেন। কেবল ওয়ারসো শহরের মেয়র বেসামরিক লোকদের নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। একমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তা পেলে পোল্যান্ড রক্ষা পেতে পারতো, কিন্তু হিটলারের চেয়ে বলশেভিকদের প্রতি তাদের ভীতি বেশি হওয়ার কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। ব্রিটেনের রক্ষণশীল সংবাদপত্রগুলোতে পূর্ব ইউরোপের ধ্বংসস্তূপের উপর দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে যুদ্ধ চালিয়ে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছিলো।

 

আনা লুইস স্ট্রং তাঁর বইতে একজন সোভিয়েত কূটনীতিকের কথা উদ্ধৃত করে বলেছেন, “আমরা যদি অনাক্রমণ চুক্তিটা না করতাম, আক্রমণটা আসতো আমাদের উপর। ইউরোপ এবং এশিয়া— দু’দিক হতে মৈত্রীবদ্ধ জার্মানি, জাপান আর ইটালি আক্রমণ করতো। ব্রিটেন ও ফ্রান্স ম্যাজিনো লাইন (ফ্রান্সের সীমান্তব্যাপী দুর্গশ্রেণী) দখলে রেখে হিটলারকে অর্থ সাহায্য দিতো। আমেরিকা হতো আমাদের বিরুদ্ধে জাপানের অস্ত্রাগার, যেমন সে এযাবৎ চীনের বিরুদ্ধে হয়ে এসেছে। অনাক্রমণ চুক্তিটা করে আমরা হিটলার, জাপান আর হিটলারের লন্ডনস্থ পৃষ্ঠপোষকদের জোট ভেঙ্গে এক থেকে অন্যকে পৃথক করে দিয়েছি। পোল্যান্ডে অভিযান নিবারণ করার আর সময় ছিলো না। চেম্বারলেইন চেষ্টাও করেননি। তবে আমরা বিশ্ব-ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে শিবিরে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছি, আমাদের আর সারা দুনিয়ার সাথে যুদ্ধ করতে হবে না।” অনাক্রমণ চুক্তি করার ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন পরবর্তী দুই বছর ধরে পূর্ব ইউরোপে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে নিজেকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে নেওয়ার সময় পেয়েছিলো। পূর্ব ইউরোপ জুড়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে হিটলারের ইউরোপ জয়ের অভিলাষ হুমকির মুখে পড়ে যায়। ১৯৪১ সালে ২২ জুন হিটলার অনাক্রমণ চুক্তি ভঙ্গ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ইতিহাসের বৃহত্তম সশস্ত্র অভিযান ‘অপারেশন বারবারোসা’ পরিচালনা করেন। এর মধ্য দিয়ে ইউরোপের পূর্ব রণাঙ্গনে শুরু হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘মহান দেশপ্রেমের যুদ্ধ।’

 

লেখকঃ ইমন রায়, ইতিহাস পর্যবেক্ষক
Please follow and like us:
Download PDF

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here