আমাদের ভবিষ্যৎ কেন গ্রন্থাগার, পঠন ও অলীক কল্পনার উপর নির্ভরশীল?

0
1272

মূলঃ নীল গেইম্যান

অনুবাদঃ ইমন রায়।

Imon Profile Web 01

লোকজন কোন পক্ষে আছে ও তার পেছনের কারণ কী, এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের পক্ষপাতিত্ব থাকতে পারে সেটা আপনাকে তাদের জানিয়ে দেওয়াটা জরুরী। এটি এখানকার সদস্যদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি ঘোষণা। তাই আমি আপনাদের সাথে পাঠাভ্যাসের ব্যাপারে কথা বলবো। আমি আপনাদেরকে গ্রন্থাগারের গুরুত্বের কথা বলবো। কল্পকাহিনী পড়া, আনন্দ পাওয়ার জন্য যা পড়া হয় তা যে কারোর কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, সে সম্বন্ধে আমি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করবো। গ্রন্থাগার ও গ্রন্থাগারিক কী এবং এদের উভয়কে সংরক্ষণ করার জন্য আমি জনসাধারণের কাছে একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাতে চাই।

আর আমি স্পষ্টত ও খোলাখুলিভাবেই পক্ষপাতদুষ্ট। আমি একজন লেখক, সাধারণভাবে বলতে গেলে একজন কল্পকাহিনী লেখক। আমি ছোটদের জন্য ও বড়দের জন্য লিখি। আমি ত্রিশ ধরে আমার শব্দমালা দিয়ে, বেশিরভাগই কাহিনী সাজিয়ে ও সেগুলো লিখে আমার জীবিকা নির্বাহ করছি। এটি অবধারিতভাবে আমার স্বার্থের মধ্যে পড়ে যে, লোকজনের পড়ার জন্য, তারা যাতে কল্পকাহিনী পড়ে তার জন্য, গ্রন্থাগার ও পড়ার স্থানের উন্নতি সাধন করার জন্য গ্রন্থাগার ও গ্রন্থাগারিকদের টিকে থাকা দরকার।

তাই একজন লেখক হিসেবে আমি পক্ষপাতদুষ্ট। তবে একজন পাঠক হিসেবে আমি আরো বেশি পক্ষপাতদুষ্ট। আর একজন ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে আমি এর চেয়েও বেশি পক্ষপাতদুষ্ট।

আর আজ রাতে আমি রিডিং এজেন্সি নামক দাতব্য সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে বক্তৃতা দিচ্ছি। লোকজনকে বলীয়ান ও উদ্যমী পাঠক হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে সবাইকে জীবনে সমান সুযোগ প্রদান করাই হলো সংস্থাটির উদ্দেশ্য। লোকজনকে বলীয়ান ও উদ্যমী পাঠক হিসেবে তৈরি করার মাধ্যমে সবাইকে জীবনকে সমান সুযোগ প্রদান করাই হলো সংস্থাটির উদ্দেশ্য। সংস্থাটি স্বাক্ষরতা কর্মসূচী, গ্রন্থাগার ও ব্যক্তিবিশেষকে সহায়তা প্রদান করে এবং পাঠাভ্যাসকে খোলাখুলিভাবে ও যথেচ্ছভাবে উৎসাহিত করে। কারণ তাদের মতে, আমরা যখন পড়ি তখনই সবকিছুর পরিবর্তন ঘটে।

আর এটা সেই পরিবর্তন এবং পড়ার সেই কাজ, যেটা নিয়ে আমি আজ রাতে এখানে কথা বলবো। পাঠাভ্যাসের প্রভাব সম্বন্ধে আমি কথা বলতে চাই। এর ভালো দিক সম্বন্ধে বলতে চাই।

আমি এক সময় যখন নিউ ইয়র্কে ছিলাম, তখন আমেরিকার বেসরকারি কারাগার গড়ে তোলার বিষয়ে অনেক কথা শুনতাম। বেসরকারি কারাগার আমেরিকার একটি দ্রুত বর্ধনশীল ইন্ডাস্ট্রি। কারাগার ইন্ডাস্ট্রিকে তার ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনা করতে হয়। যেমন, ইন্ডাস্ট্রিতে কতগুলো প্রকোষ্ঠের দরকার পড়বে? আজ থেকে পনেরো বছর পর বন্দীর সংখ্যা কত হতে পারে? তারা দেখলেন যে, খুব সহজেই তারা এটি আন্দাজ করে নিতে পারেন। দশ ও এগারো বছরের বাচ্চাদের কত শতাংশ পড়তে পারে না এবং বিশেষ করে আনন্দের সহিত পড়তে পারে না, এই প্রশ্নের উপর ভিত্তি করে একটি সহজ এলগরিদম ব্যবহার করার মাধ্যমে তা বের করা যায়।

ব্যাপারটা  আপনি বলতে পারেন না যে, একটি শিক্ষিত সমাজে কোনো অপরাধবোধ নেই। তবে এখানে অনেক বাস্তব পারস্পরিক সম্পর্ক বিদ্যমান।

আর আমি মনে করি এই পারস্পরিক সম্পর্কগুলোর মধ্যে যেটা সবচেয়ে সাধারণ, সেটা খুব সাধারণ কিছু থেকেই এসেছে। সেটা হলো, শিক্ষিত লোকেরা কল্পকাহিনী পড়ে।

কল্পকাহিনীর দু’টি প্রয়োগ আছে। প্রথমত, এটি পাঠাভ্যাসে প্রবেশের জন্য মাদক স্বরূপ। পরে কী ঘটতে যাচ্ছে তা জানার তাড়না, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টাতে চাওয়ার তাড়না, সামনে এগিয়ে যাওয়ার তাড়না, এমনকি যদি কঠিনও হয়, কারণ কেউ একজন সমস্যায় পড়েছে এবং কীভাবে এই সবকিছু শেষ হতে যাচ্ছে তা আপনাকে জানতে হবে… এটাই খুব বাস্তব একটা তাড়না। আর এটা আপনাকে নতুন শব্দ শিখতে, নতুন জিনিস চিন্তা করতে, সামনে এগিয়ে যেতে বাধ্য করে। পড়া যে আনন্দদায়ক তা আবিষ্কার করতে আপনাকে বাধ্য করে। একবার যখন আপনি এটা জেনে গেছেন, তখন সবকিছু পড়ার পথে উঠে গেছেন। আর পড়াটাই আসল ব্যাপার। কয়েক বছর আগে শোরগোল উঠেছিলো যে, আমরা সাক্ষরতা-উত্তর এক বিশ্বে বসবাস করছি যেখানে লিখিত শব্দ থেকে অর্থ খুঁজে বের করার সামর্থ্য এক রকম প্রয়োজনাতিরিক্ত বিষয়, কিন্তু সেই দিন এখন আর নেই। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শব্দ এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণঃ আমরা শব্দ দিয়ে পৃথিবীর দিক নির্দেশনা করি, এবং পুরো পৃথিবী যখন ওয়েবে আটকে যায় তখন আমাদের সেটা অনুসরণ করা, যোগাযোগ স্থাপন করা ও আমরা যা পড়ছি তা বুঝানোর দরকার হয়। যেসব মানুষ একে অপরকে বুঝতে পারে না তারা ধারণা আদান-প্রদান করতে পারে না, যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে না এবং অনুবাদ কার্যক্রম কেবল সে পর্যন্তই চলে।

শিশুদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজ পথটি হচ্ছে তাদের পড়তে শিক্ষা দেওয়া এবং পড়া যে একটা আনন্দদায়ক কাজ সেটা তাদের দেখানো। আর এর সবচেয়ে সহজ মানে দাঁড়ায়, তারা যে ধরনের বইয়ে আনন্দ পায় তা খুঁজে দেওয়া, তাদেরকে সেসব বইয়ের প্রবেশাধিকার দেওয়া ও সেগুলো তাদেরকে পড়তে দেওয়া।

আমি মনে করি না শিশুদের জন্য খারাপ বই বলে কিছু আছে। শিশুতোষ বইগুলোর একটি অংশকে, একটি ধারাকে ও সম্ভবত একজন লেখকের দিকে আঙ্গুল তোলা, এবং সেসব লেখকের বইকে খারাপ বই হিসবে চিহ্নিত করা ও শিশুদেরকে সেসব বই পড়া থেকে বিরত রাখা অনেক বয়ঃপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে মাঝেমধ্যে কেতায় পরিণত হয়েছে। আমি বারবার এটা ঘটতে দেখেছিঃ এনিড ব্লাইটনকে একজন খারাপ লেখক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিলো, তেমনি আর.এল স্টাইন এবং আরো ডজন খানেক লেখককে এমনটা বলা হয়েছিলো। কমিকস্‌কে তো প্রতিপালিত নিরক্ষরতা হিসেবে নিন্দিত করা হয়েছে।

এটা বাজে কথা। এটা উন্নাসিকতা ও মূর্খতা। শিশুদের জন্য এমন কোনো খারাপ লেখক নেই, যাকে শিশুরা পছন্দ করে ও তার বই খুঁজে বের করে পড়তে চায়। এর কারণ হলো প্রতিটি শিশুই আলাদা। তারা তাদের পছন্দমত কাহিনী খুঁজে বের করে এবং তারা সেই কাহিনীগুলোতে নিজেদেরকে নিয়ে যায়। গতানুগতিক, বিরক্তিকর ধারণা তাদের কাছে গতানুগতিক ও বিরক্তিকর নয়। এই প্রথম শিশুটি এর মুখোমুখি হয়েছে। শিশুরা ভুল জিনিস পড়ছে এমনটা মনে করে তাদেরকে পড়তে নিরুৎসাহিত করবেন না। আপনি যে কল্পকাহিনী পছন্দ করেন না, হয়ত সেটাই আপনাকে আপনার অন্যান্য পছন্দের বইয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আর সবার রুচি আপনার মতো এক রকম নয়।

বড়রা সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়েও সহজেই একটি শিশুর পড়ার প্রতি ভালোবাসাকে নষ্ট করে দিতে পারে। সেটা হতে পারে শিশুদের পছন্দমত জিনিস পড়তে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে, কিংবা আপনার পছন্দমত মূল্যবান ও একই সাথে কাঠখোট্টা বই দেওয়ার মাধ্যমে যেটা ভিক্টোরিয়ান “উন্নতিশীল” সাহিত্যের একবিংশ সংস্করণ। আপনি এমন একটি প্রজন্মের সাথে যবনিকা টানবেন যারা পাঠাভ্যাসকে বিরক্তিকর এবং ফালতু, নিরানন্দ হিসেবে ভাবতে প্রণোদিত হয়েছে।

আমাদের শিশুদেরকে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার সিঁড়িতে তুলে দেওয়া দরকারঃ তারা যেটা পড়ে আনন্দ পায় সেটাই ধাপে ধাপে তাদেরকে সাক্ষরতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। (আর এই লেখকের মতো এমন কিছু করতে যাবেন না। আমার ১১ বছর বয়সী মেয়ে যখন আরএল স্টাইন পড়ছিলো, তখন আমি ওকে সেখান থেকে সরিয়ে স্টিফেন কিং-এর ‘ক্যারি’র একটি কপি দিয়ে বললাম, ওগুলো ভালো লাগলে এটাও ভালো লাগবে! হলি তার টিনএজ-এর বাকি বছরগুলোতে তৃণভূমির অভিবাসীদের নিরূপদ্রব গল্পগুলো ছাড়া আর কিছুই পড়েনি, এবং স্টিফেন কিং-এর নাম উল্লেখ করা হলে সে রাগান্বিত হয়ে আমার দিকে তাকায়।)

এছাড়া কল্পকাহিনীগুলো দ্বিতীয় যে কাজটা করে সেটা হলো সহানুভূতি তৈরি করা। আপনি যখন টিভি দেখেন বা মুভি দেখেন তখন আপনি অন্যদের ক্ষেত্রে যে ব্যাপারগুলো ঘটে সেগুলোই দেখেন। কথাসাহিত্য এমন একটি জিনিস যেটা আপনি ২৬টি অক্ষর থেকে এবং কতিপয় বিরামচিহ্ন দিয়ে তৈরি করেন, আর আপনি এবং শুধু আপনি একাই আপনার কল্পনা দিয়ে একটি জগত তৈরি করেন যা অন্যরা তাদের চোখ দিয়ে দেখতে পারেন। আপনি অনেক কিছু অনুভব করতে পারেন, ক্ষেত্র ও জগতে যেতে পারেন যেটা আপনি কখনোই অন্য কোনোভাবে পারতেন না। সেই সাথে আপনি বুঝতে পারবেন অন্য সবাই আসলে আপনি নিজেই। আপনি অন্য কেউ হয়ে যাচ্ছেন, এবং যখন আপনি আপনার আপন জগতে ফিরে আসেন তখন আপনি কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছেন।

আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তিসত্ত্বার ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষের গোষ্ঠীবদ্ধ হতে পারার একটি হাতিয়ার হলো সহানুভূতি। জগতে আপনার পথ তৈরি করে নেওয়ার জন্য আপনি যখন অত্যাবশ্যকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পড়ছেন, তখনই আপনি কিছু বিষয় খুঁজে বের করতে পারছেন। আর সেটা হচ্ছেঃ পৃথিবীটা এমন না হলেও হবে। বিষয়গুলো ভিন্ন ধরনের হতে পারে।

২০০৭ সালে আমি চীনে ছিলাম, চীনের ইতিহাসের প্রথম পার্টি-অনুমোদিত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ও ফ্যান্টাসি শীর্ষক সম্মেলনে গিয়েছিলাম। তখন এক পর্যায়ে আমি একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে এক পাশে ডেকে নিয়ে এই সম্মেলন আয়োজন করার কারণ জিজ্ঞেস করলাম। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ ছিলো। তাহলে কীভাবে এই পরিবর্তন দেখা দিলো?

তিনি বললেন, খুবই সহজ ব্যাপার। যদি অন্যরা কোনো পরিকল্পনা দিতো তাহলে চীনারা সেটা বাস্তবায়ন করতে পটু ছিলো। কিন্তু তারা নতুন কিছু প্রবর্তন ও উদ্ভাবন করতো না। তারা চিন্তা করতো না। এজন্য তারা যুক্তরাষ্ট্র, অ্যাপেল, মাইক্রোসফট, গুগল এসব জায়গা প্রতিনিধি দল প্রেরণ করলো। তারা সেসব জায়গার লোকদের জিজ্ঞেস করলো, কারা এদের ভবিষ্যৎ কল্পনার কাজে নিয়োজিত আছে। তারা তখন দেখতে পেলো যে, এদের সবাই উঠতি বয়সে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী পড়েছিলো।

কল্পকাহিনী পারে আপনাকে একটি ভিন্ন জগতের সন্ধান দিতে। এটি আপনাকে এমন কোথাও নিয়ে যেতে পারে যেখানে আপনি কখনোই ছিলেন না। আপনি যখনই ভিন্ন জগতে ঘুরতে যান, যারা কাল্পনিক ফল খেয়েছিলো তাদের মতো, তখন আপনি যে জগতে বেড়ে উঠেছেন সেখানে কখনো পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারবেন না। অতৃপ্তি জিনিসটা ভালো— অতৃপ্ত মানুষ তাদের জগতকে বিশেষায়িত করতে ও উন্নত করতে পারে, আরো ভালোভাবে রেখে যেতে পারে, আরো ভিন্নভাবে রেখে যেতে পারে।

যেহতু আমরা এই বিষয় নিয়ে কথা বলছি, তাই পলায়ন প্রবৃত্তি নিয়ে আমি কিছু কথা বলতে চাই। আমি শব্দটিকে এমনভাবে বলতে শুনেছি যেন এটা একটা বাজে ব্যাপার। “পলায়নপর” কল্পকাহিনী যেন বিশৃঙ্খল, মূর্খ ও বিভ্রান্ত লোকদের দ্বারা ব্যবহৃত একটি সস্তা নিদ্রাকর্ষক মাদক, আর অনুকরণপ্রিয় কল্পকাহিনী কেবল যেন বড়দের ও বাচ্চাদের জন্য উপযুক্ত, যেগুলো পড়লে পাঠক সবচেয়ে জঘন্য দুনিয়ায় নিজেকে আবিষ্কার করে।

যদি কোনো অসম্ভব পরিস্থিতিতে, কোনো এক অপ্রীতিকর জায়গায় আপনাকে অসুস্থ বলে মনে করে এমন লোকজনের মাঝে আপনি আটকা পড়তেন, এবং কেউ আপনাকে একটি সাময়িক পরিত্রাণের প্রস্তাব করতো তাহলে আপনি কেন সেটা গ্রহণ করতেন না? আর পলায়নপর কল্পকাহিনী একটি দুয়ার খুলে দিয়ে বাইরের সূর্যালোক দেখায়, আপনাকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে যায় যেটার নিয়ন্ত্রণে আপনি আছেন, যাদেরকে আপনি আপনার পাশে চান (আর বই হলো বাস্তব জায়গা এ সম্বন্ধে ভুল করবেন না) তাদের সাথে; এবং আরো গুরুত্বপূর্ণভাবে আপনার পলায়নের সময় বই-ই পারে পৃথিবী ও আপনার অবস্থা সম্পর্কে আপনাকে জ্ঞানদান করতে, আপনাকে হাতিয়ার ও বর্ম দিতে পারেঃ এই আসল জিনিসগুলো আপনি আপনার বন্দীশালায় ফেরত নিয়ে যেতে পারেন। দক্ষতা ও জ্ঞান এবং কৌশলের সাহায্যে আপনি সত্যি সত্যি পালিয়ে যেতে পারেন।

জে.আর.আর টোলকিয়েন আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, শুধু কারা-পরিদর্শকরাই পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সমালোচনা করে থাকে।

একটি শিশুর পড়ার প্রতি ভালোবাসাকে ধ্বংস করার আরেকটি পন্থা হচ্ছে অবশ্যই কোনো ধরনের বই না থাকাটা নিশ্চিত করা। আর তাদেরকে সেই বইগুলো পড়তে জায়গা না দেওয়া। আমি ভাগ্যবান ছিলাম। আমার এলাকায় একটি দারুণ গ্রন্থাগার ছিলো যেটা বিকশিত হচ্ছিলো। আমার বাবা-মা ছিলেন সেই ধরনের মানুষ যাদেরকে গ্রীষ্মের ছুটির দিনগুলোতে কাজে যাওয়ার সময় আমাকে গ্রন্থাগারে নামিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে রাজি করানো যেতো। আর গ্রন্থাগারিকরা একটি ছোট, সঙ্গীবিহীন ছেলেকে প্রতিদিন সকালে ছোটদের গ্রন্থাগারে যেতে ও কার্ড ক্যাটালগের মধ্যে সময় পার করতে দেখে, ভূত অথবা জাদু কিংবা রকেটের বই খুঁজতে দেখে, ভ্যাম্পায়ার অথবা গোয়েন্দা কিংবা ডাইনি নয়ত বিস্ময়কর জিনিসের বই খুঁজতে দেখে কিছু মনে করতেন না। ছোটদের গ্রন্থাগারে পড়া শেষ করে আমি বড়দের বই পড়তে শুরু করি।

তারা ভালো গ্রন্থাগারিক ছিলেন। তারা বই পছন্দ করতেন ও বই পড়তে দেখতে পছন্দ করতেন। তারা আমাকে অন্য গ্রন্থাগার থেকে ধার করার মাধ্যমে বই অর্ডার করতে শিখিয়েছিলেন। আমি কী পড়ছি সেটা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা ছিলো না। তাদের শুধু এটা দেখতে ভালো লাগতো যে, বড় বড় চোখের ছেলেটি পড়তে ভালোবাসে এবং আমি যেসব বই পড়তাম সেগুলো নিয়ে তারা কথা বলতেন, তারা আমাকে একযোগে অন্যান্য বই খুঁজে দিতেন, আমাকে সাহায্য করতেন। তারা আমার সাথে অন্যান্য পাঠকের মতোই আচরণ করতেন— এর চেয়ে বেশি বা কম নয়— অর্থাৎ তারা আমাকে সমীহ করতেন। আট বছর বয়সের শিশু হিসেবে সমীহ আচরণ পাওয়ার মতো অভ্যস্ততা আমার ছিলো না।

তবে গ্রন্থাগারগুলো স্বাধীনতার সাথে সম্পর্কিত। পড়ার স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, যোগাযোগের স্বাধীনতা। এগুলো শিক্ষার (যা আমাদের স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকালেই শেষ হয়ে যায় না) সাথে সম্পর্কিত, পরিবেশের সাথে সম্পর্কিত, নিরাপদ স্থান নির্মাণের সাথে সম্পর্কিত এবং তথ্য অধিগমনের সাথে সম্পর্কিত।

আমি চিন্তিত যে একুশ শতকে গ্রন্থাগারের স্বরূপ ও এগুলোর উদ্দেশ্য সম্বন্ধে মানুষের ভুল ধারণা আছে। যদি আপনি একটি গ্রন্থাগারকে বই-ভর্তি একটি শেলফ হিসেবে চিন্তা করেন তাহলে এটা এই জমানায় সেকেলে বা পুরাতন বলে মনে হতে পারে যেখানে সব না হলেও অধিকাংশ ছাপানো বই ডিজিটালভাবে টিকে আছে। তবে এভাবে চিন্তা করলে মৌলিক বিষয়টি বুঝতে ভুল হবে।

আমি মনে করি তথ্যের প্রকৃতির সাথে এর সম্পর্ক আছে। তথ্যের মূল্য আছে এবং সঠিক তথ্যের প্রচুর মূল্য আছে। সমগ্র মানব ইতিহাসের মধ্যে আমরা তথ্য অপ্রতুলতার যুগ পার করে এসেছি। আর দরকারি তথ্য পাওয়া সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিলো এবং এটা সবসময়ই কিছু জিনিসের জন্য দরকারি ছিলোঃ যেমন, কখন শস্য রোপণ করতে হবে, কোথায় জিনিসগুলো, ম্যাপ ও ইতিহাস এবং গল্প খুঁজতে হবে। এগুলো সবসময়ই আহার ও সাহচর্যের জন্য দরকারি ছিলো। তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, আর যারা এটি পেয়েছে ও হস্তগত করেছে তারা এই পরিষেবার জন্য অর্থ নিয়েছে।

বিগত কয়েক বছরে আমরা তথ্য ঘাটতির অর্থনীতি থেকে বের হয়ে তথ্য প্রাচুর্যের অর্থনীতিতে প্রবেশ করেছি। গুগলের এরিক শ্মিডের মতে, মানবজাতি এখন প্রতি দুই দিনে যে পরিমাণ তথ্য সৃষ্টি করছে তা সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে শুরু করে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সৃষ্ট তথ্যের সমান। আপনারা যারা হিসাব রাখেন তাদের জন্য এটি দিনপ্রতি পাঁচ এক্সোবাইটের ডেটা। মরুভূমিতে বেড়ে উঠা অপ্রতুল উদ্ভিদ খুঁজে বের করা নয়, বরং জঙ্গলে বেড়ে উঠা একটি নির্দিষ্ট উদ্ভিদ খুঁজে বের করাটাই চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। আসলে দরকারি জিনিস খুঁজে পেতে গেলে আমাদের সেই তথ্যকে সঠিক দিক নির্দেশনা দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে।

মানুষ তথ্যের জন্য গ্রন্থাগারে যায়। বই হলো তথ্য হিমশৈলের শীর্ষমাত্রঃ সেগুলো সেখানেই আছে, আর গ্রন্থাগারগুলো মুক্তভাবে ও বৈধ উপায়ে আপনার বইয়ের যোগান দিতে পারে। আগের যেকোনো সময়ের অধিক সংখ্যক শিশু গ্রন্থাগার থেকে কাগুজে, ডিজিটাল, অডিও এই সব ধরনের বই ধার করে নিয়ে পড়ছে। কিন্তু যাদের কম্পিউটার নেই, ইন্টারনেট সংযোগ নেই, তাদের জন্য গ্রন্থাগার খুবই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। তারা সেখানে বিনামূল্যে অনলাইনে যেতে পারে যখন চাকরি খোঁজা, চাকরির জন্য আবেদন করা বা সুযোগ-সুবিধার জন্য আবেদন করার পন্থাগুলো একচেটিয়াভাবে অনলাইনে স্থানান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। গ্রন্থাগারিকরা সেই জগতকে দিক নির্দেশ করার জন্য এসব মানুষকে সাহায্য করতে পারে।

সব বইকে স্ক্রিনে স্থানান্তর করতে হবে বা করা উচিত এমনটা আমি বিশ্বাস করি না, যেমন কিন্ডেল আসার বিশ বছরেরও বেশি সময় আগে ডগলাস অ্যাডাম আমাকে বলেছিলেন, একটা কাগুজে বই হলো একটা হাঙরের মতো। হাঙর অনেক পুরাতনঃ ডায়নোসরের আগেও সমুদ্রে হাঙর ছিলো। আর হাঙরদের এখনো টিকে থাকার পেছনের কারণ হলো তারা অন্য কিছু হওয়ার চেয়ে হাঙর হয়ে থাকতেই বেশি ভালো পারে। কাগুজে বইগুলো অনমনীয়, এগুলো ধ্বংস করা কষ্টসাধ্য, পানি প্রতিরোধী, সৌরশক্তি দ্বারা চালিত, আপনার হাতে রাখার জন্যই ভালো। এগুলো বই হিসেবে থাকতেই বেশি ভালো এবং এগুলোর জন্য সবসময় একটি জায়গা বরাদ্দ থাকবে। এগুলো গ্রন্থাগারের অংশ, যেভাবে গ্রন্থাগার ইতোমধ্যে এমন একটি জায়গায় পরিণত হয়েছে যেখানে ই-বুক ও অডিও বুক এবং ডিভিডি ও ওয়েব কনটেন্টে প্রবেশ করার সুযোগ পাওয়া যায়।

একটি গ্রন্থাগার হলো তথ্যের আধার এবং এটি সকল নাগরিকদের সমান প্রবেশাধিকার প্রদান করে। এটি স্বাস্থ্যগত তথ্য এবং মানসিক স্বাস্থ্যগত তথ্যকেও ধারণ করে। এটি একটি কমিউনিটি স্পেস। এটি একটি নিরাপদ স্থান, পৃথিবীর বুকে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এটি গ্রন্থাগারিকদের জায়গা। ভবিষ্যতের গ্রন্থাগারগুলো কেমন হবে সেটা আমাদের কল্পনা করা উচিত।

টেক্সট ও ই-মেইলের দুনিয়ায়, লিখিত তথ্যের দুনিয়ায় সাক্ষরতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পড়া ও লিখা দরকার। আমাদের বৈশ্বিক নাগরিক হওয়া দরকার যারা সহজেই পড়তে পারে, যা পড়ছে তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে, সূক্ষ্ম পার্থক্য বুঝতে পারে এবং নিজদেরকে বুঝতে পারে।

গ্রন্থাগার সত্যিকার অর্থে ভবিষ্যতের দ্বার। এটা দুঃখজনক যে, বিশ্বজুড়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ অর্থ সাশ্রয় করার একটি সহজ উপায় হিসেবে গ্রন্থাগারগুলো বন্ধ করে দেওয়ার সকল সুযোগ লুফে নিচ্ছে। অথচ তারা এটা দেখছে না যে, তারা ভবিষ্যৎ থেকে চুরি করে আজকের ক্ষতিপূরণ করে চলছে।

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলাপমেন্টের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা অনুসারে ইংল্যান্ড হলো “একমাত্র দেশ যেখানে অন্যান্য নিয়ামক যেমন লিঙ্গ, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং পেশার ধরন বিবেচনায় নিয়ে দেখা গেছে, সবচেয়ে বয়স্ক মানুষেরা সাক্ষরতা ও সংখ্যা-সংক্রান্ত ধারণা উভয় ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম বয়সীদের চেয়ে অধিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।”

অথবা অন্যভাবে বলা যায়, আমাদের সন্তানরা ও তাদের উত্তরসূরীরা আমাদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত ও সংখ্যা-সংক্রান্ত ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত কম ধারণাসম্পন্ন। তারা পৃথিবীকে সঠিক দিক নির্দেশ করার ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত কম সক্ষম, সমস্যা সমাধানের জন্য একে বুঝার ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত কম সক্ষম। তাদের খুব সহজেই মিথ্যা বলা যাবে ও পথভ্রষ্ট করা যাবে, তারা পৃথিবীকে পরিবর্তন করতে অপেক্ষাকৃত কম সক্ষম হবে যেখানে তারা নিজেদের কমজোর হিসেবে খুঁজে পাবে। এই সবকিছু। আর দেশ হিসেবে ইংল্যান্ড অন্যান্য উন্নত দেশের চেয়ে পিছিয়ে পড়বে কারণ তার দক্ষ জনশক্তির অভাব দেখা দিবে।

মৃতের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের উপায় হলো বই। আমাদের মাঝে যারা আর নেই তাদের কাছ থেকে আমরা যে উপায়ে শিখি, তার উপর ভিত্তি করে মানবজাতি নিজেকে গড়ে তুলেছে, অগ্রসর হয়েছে, বারবার জ্ঞানকে পুনঃআত্মস্থ না করে বরং ক্রমবর্ধমান করেছে। কিছু উপাখ্যান কয়েকশো বছরের চেয়েও পুরাতন। সেগুলো সংস্কৃতি এবং যেসব ভবনে সেগুলো প্রথম উচ্চারিত হয়েছিলো, তাকেও ছাপিয়ে গেছে।

আমি মনে করি ভবিষ্যতের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আছে। শিশুদের প্রতি, যেসব শিশুরা বড় হবে তাদের প্রতি, তারা যে পৃথিবীকে বাস করবে তার প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা আছে। পাঠক হিসেবে, লেখক হিসেবে, নাগরিক হিসেবে আমাদের সবার দায়বদ্ধতা আছে। আমি ভেবেছি কিছু দায়বদ্ধতার কথা এখানে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো।

আমি বিশ্বাস করি ব্যক্তিগত ও সর্বজনীন স্থানে আনন্দ লাভের জন্য আমাদের পড়ার দায়বদ্ধতা আছে। যদি আমরা মজা পাওয়ার জন্য পড়ি, যদি অন্যরা আমাদের পড়তে দেখে তাহলে আমরা শিখি,  আমরা আমাদের কল্পনার অনুশীলন করি। আমরা তখন অন্যদের দেখাতে পারি যে, পড়া একটি ভালো ব্যাপার।

গ্রন্থাগারগুলোকে সহায়তা করার ব্যাপারে আমাদের দায়বদ্ধতা আছে। গ্রন্থাগার ব্যবহারে, অপরকে গ্রন্থাগার ব্যবহারে উৎসাহিত করতে, গ্রন্থাগার বন্ধের প্রতিবাদ করার ব্যাপারে আমাদের দায়বদ্ধতা আছে। যদি আপনি গ্রন্থাগারের কদর না করেন তাহলে তথ্য অথবা সংস্কৃতি কিংবা জ্ঞানের কদর করতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে আপনি অতীতের কণ্ঠরোধ করছেন এবং ভবিষ্যতের ক্ষতি করছেন।

সন্তানদেরকে উচ্চকণ্ঠে পড়ে শোনানোর দায়বদ্ধতা আছে আমাদের। তারা যেসব জিনিস উপভোগ করে তা পড়ে শোনানোর দায়বদ্ধতা। ইতোমধ্যে যেসব গল্পে আমরা হাঁপিয়ে উঠেছি সেগুলো তাদেরকে পড়ে শোনানোর দায়বদ্ধতা। শব্দ করে পড়ার, সেটা আনন্দদায়ক করার এবং তারা নিজেরা পড়তে শিখেছে বলে তাদেরকে পড়ে শোনানো বন্ধ না করার দায়বদ্ধতা। উচ্চকণ্ঠে পড়ে শোনানোর সময়টুকু বন্ধন গড়ে তোলার সময় হিসেবে ব্যবহার করুন, ওই সময়ে যেন কোনো ফোন ধরা না হয়, পৃথিবীর অন্য সব বিক্ষেপকে যেন এক পাশে সরিয়ে রাখা হয়।

আমাদের ভাষা ব্যবহার করার দায়বদ্ধতা আছে। আমাদের নিজেদেরকে তাগাদা দিতে হবেঃ শব্দগুলো কী অর্থ প্রকাশ করে ও কীভাবে সেগুলোকে মেলে ধরতে হয় তা জানার জন্য, স্পষ্টভাবে যোগাযোগ স্থাপন করার জন্য, আমরা যা বুঝাতে চাই তা বলার জন্য। আমরা অবশ্যই ভাষাকে স্থির করার চেষ্টা করবো না, কিংবা শ্রদ্ধা নিবেদন করার জন্য একে মৃত হিসেবে জাহির করবো না। বরং একে একটি জীবিত বস্তু হিসেবে আমাদের ব্যবহার করা উচিত, যেটা বয়ে চলে, শব্দ ধার করে, সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে অর্থ ও উচ্চারণ আরোপ করে।

আমাদের পাঠকদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আছে, বিশেষত আমরা যারা শিশুদের জন্য লিখি। এই দায়বদ্ধতা হলো প্রকৃত জিনিস লেখার দায়বদ্ধতা, বিশেষভাবে আমরা যখন মানুষের গল্প তৈরি করি যাদের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। এর মাধ্যমে আমরা উপলব্ধি করতে পারি, যা ঘটে তার মধ্যে সত্য থাকে না বরং সত্য আমাদের স্বরূপকে প্রকাশিত করে। মোটের উপর কল্পকাহিনী হলো সেই মিথ্যা যা সত্যকে প্রকাশ করে। পাঠকদের বিরক্তির উদ্রেক না করে বরং পৃষ্ঠা উল্টাতে তাদের উৎসাহিত করার ব্যাপারে আমাদের দায়বদ্ধতা আছে। মোটের উপর অনিচ্ছুক পাঠকের জন্য অন্যতম সেরা চিকিৎসা হচ্ছে এমন একটি কাহিনী যেটা না পড়ে সে থাকতে পারে না। আর আমাদেরকে অবশ্যই আমাদের পাঠকদের কাছে প্রকৃত ঘটনা বলতে হবে এবং তাদেরকে হাতিয়ার ও বর্ম প্রদান করতে হবে, আর এই সবুজ পৃথিবীতে আমাদের স্বল্পকালীন অবস্থানে কুড়িয়ে পাওয়া আহরিত জ্ঞান হস্তান্তর করতে হবে। প্রাপ্তবয়স্ক পাখিরা যেভাবে শূককীট চিবিয়ে সেটা তাদের বাচ্চাদের খাওয়ায় সেভাবে জাবর-কাটা নীতিবাক্য ও বাণী আমাদের পাঠকদের কাছে প্রচার না করার, ছবক না দেওয়ার, তাদেরকে জোর করে না গেলানোর দায়বদ্ধতা আছে আমাদের। আর যেকোনো পরিস্থিতিতে কখনোই শিশুদের জন্য আমাদের এমন কিছু না লেখার দায়বদ্ধতা আছে, যেটা আমরা নিজেরা পড়তে চাই না।

শিশুদের লেখক হিসেবে আমাদের এটি বুঝার ও স্বীকার করার দায়বদ্ধতা আছে যে আমরা গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করছি। কারণ আমরা যদি সব গুলিয়ে ফেলি এবং এমন বই লিখি যার ফলশ্রুতিতে শিশুরা পড়া থেকে ও বই থেকে দূরে সরে যায় তাহলে আমরা আমাদের ভবিষ্যতকে অবনমিত করবো ও তাদের ভবিষ্যতকে খর্ব করবো।

বড় ও ছোট, লেখক ও পাঠক— আমাদের সবার অলীক কল্পনা করার দায়বদ্ধতা আছে। আমাদের চিন্তা করার দায়বদ্ধতা আছে। আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করি যেখানে সমাজ এতো বিশাল যে একজন ব্যক্তি দেয়ালের একটি পরমাণু কিংবা ধানক্ষেতের ক্ষুদ্র পরিমাণ ধানের চেয়ে বেশি কিছু নয়। সেখানে কারোর পক্ষে কোনো কিছু পরিবর্তন করতে না পারার ভান করা সহজ। তবে সত্যটা হলো প্রত্যেকে তাদের জগত বহুবার পরিবর্তন করে, ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে এবং ভিন্ন কিছু চিন্তা হতে পারে এই চিন্তা করেই তারা এটা করে থাকে।

আপনার চারপাশে তাকানঃ আমি সত্যি তাই বুঝাতে চাইছি। এক মূহুর্তের জন্য থামুন এবং আপনি যে কক্ষে আছেন তার চারপাশে তাকান। আমি এমন স্পষ্ট কিছু দেখাতে চাইছি যেটা সবাই ভুলে যায়। এটা হচ্ছে আপনি দেয়ালসহ যা কিছু দেখতে পান তার সবটাই কিছু ক্ষেত্রে কল্পিত। কেউ একজন মাটিতে বসার চেয়ে চেয়ারে বসা’কে সহজ ভেবেছিলো ও চেয়ারের কথা চিন্তা করেছিলো। আমরা সবাই যাতে বৃষ্টিতে ভিজে না গিয়ে এখন এই মূহুর্তে লন্ডনে আমি যেভাবে আপনাদের সাথে কথা বলছি, সেটা অন্য কাউকে চিন্তা করতে হয়েছিলো। এই কক্ষে ও এর জিনিসগুলো, আর এই ভবনের অন্য সব জিনিসগুলো, এই নগরী সবই টিকে আছে কারণ মানুষ বারবার এগুলো চিন্তা করেছিলো।

পৃথিবীকে সুন্দর করে তোলার দায়বদ্ধতা আছে আমাদের। আমরা পৃথিবীকে যেমনটা পেয়েছি তার চেয়ে খারাপভাবে রেখে না যাওয়ার, মহাসাগরগুলো শূন্য না করার, আমাদের সমস্যাগুলোকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে না যাওয়ার দায়বদ্ধতা। নিজেদের তৈরি করা সমস্যাগুলো সমাধান করার দায়বদ্ধতা আমাদের আছে, আর আমাদের সন্তানদের জন্য এমন পৃথিবী রেখে না যাওয়ার দায়বদ্ধতা আছে যাকে আমরা আমাদের অদূরদর্শিতার মাধ্যমে বিশৃঙ্খল করেছি, ঠকিয়েছি ও বিকৃত করেছি।

আমাদের প্রয়োজনের কথা আমাদের রাজনীতিবিদদের জানানোর দায়বদ্ধতা আছে। যে পার্টির রাজনীতিবিদরা যোগ্য নাগরিক তৈরিতে পড়ার গুরুত্ব বোঝেন না, যারা জ্ঞান সংক্ষরণ ও রক্ষা করার জন্য এবং সাক্ষরতাকে উৎসাহিত করার জন্য কাজ করতে চান না তাদের বিপক্ষে ভোট না দেওয়ার দায়বদ্ধতা আছে আমাদের। এটি দলভিত্তিক রাজনীতির ব্যাপার নয়। এটি একটি সাধারণ মানবিক ব্যাপার।

কীভাবে আমরা আমাদের শিশুদের বুদ্ধিমান বানাতে পারি এই ব্যাপারে একবার আলবার্ট আইনস্টাইনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো। তাঁর উত্তর ছিলো সৎ ও জ্ঞানগর্ভ। তিনি বলেছিলেন, “যদি আপনারা আপনাদের শিশুদের বুদ্ধিমান বানাতে চান তাহলে রূপকথার গল্প পড়ে শোনান। যদি আপনারা তাদের আরো বুদ্ধিমান বানাতে চান তাহলে আরো বেশি করে রূপকথার গল্প পড়ে শোনান।” তিনি পড়ার ও চিন্তাশক্তির মূল্য বুঝেছিলেন। আমি আশা করি আমরা আমাদের শিশুদের এমন পৃথিবী উপহার দিতে পারবো যেখানে তারা পড়বে ও তাদেরকে পড়ে শোনানো হবে, এবং তারা কল্পনা করতে ও উপলব্ধি করতে পারবে।

(২০১৩ সালের ১৪ অক্টোবর লন্ডনের বার্বিকানে দ্য রিডিং এজেন্সি-র জন্য নীল গেইম্যানের দেওয়া বক্তৃতার একটি সম্পাদিত রূপ। পঠন ও গ্রন্থাগার বিষয়ে নেতৃস্থানীয় লেখক ও চিন্তকদের মৌলিক, চ্যালেঞ্জিং ভাবনা আদান-প্রদান করার উদ্দেশ্যে ২০১২ সালে দ্য রিডিং এজেন্সি-র বার্ষিক বক্তৃতা সিরিজ চালু করা হয়।)  

Please follow and like us:
Download PDF

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here