“মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বেচ্ছাচারিতার সংস্কৃতি” – একটি সামাজিক গবেষণার পর্যালোচনা

0
1218

ইউ এস রোকেয়া আক্তার হিমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একজন পিএইচডি গবেষক, তিনি তার তত্ত্বালোচনা হিসেবে ভাষা, সংস্কৃতি এবং স্কুলিং কে বেঁছে নিয়েছেন যেখানে তিনি সমাজবিজ্ঞানী বর্দ্যুর তত্ত্বীয় কাঠামোকে বাংলাদেশী সমাজে প্রয়োগ করেছেন। তারই একটি গবেষণা প্রবন্ধ হল “Culture of Arbitrariness in Madrasah Education System” যেখানে তিনি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। সেরিদের তরুণ গবেষক অপরাজিতা মিত্র চেষ্টা করেছেন আমাদের সামনে উক্ত গবেষণা পত্রটি উপস্থাপণের।

========================================================

 

বিগত কয়েক দশকে দেখা গিয়েছে যে, জঙ্গিরা ছাত্রদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ক্ষতিকর কাজে  নিয়োজিত করছে। প্রচার মাধ্যমে এর সাথে জড়িত থাকার পেছনে উঠে এসেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন মাদ্রাসার  নাম। ভালো কাজের নাম দিয়ে শিক্ষার্থীদের অপব্যবহার ও তরুণদের উপর এর প্রতিক্রিয়া এই আলোচনার বিষয়।

ধর্মীয়  চরমপন্থী গোষ্ঠীর সাথে মাদ্রাসার ছাত্রদের জড়িত থাকার সরাসরি সংযোগ পাওয়া না গেলেও জামাত –ই –   ইসলামের  নেতার অর্থায়নে মাদ্রাসা পরিচালনা দেখা গিয়েছে । এর ফলস্বরূপ সেই মাদ্রাসা জামাত – ই – ইসলামের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের অংশ হবার প্রতিশ্রুতি দেয় ।  দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চেতনা সম্পর্কে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের  অজ্ঞতা  লক্ষণীয় । তাই সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ের ক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধের সঠিক ধারণার ভিত্তিতে যুক্তি   স্থাপন করা প্রয়োজন ।

লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশে মূলধারা শিক্ষা ব্যবস্থা তথা বাংলা মাধ্যমের পাশাপাশি ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসা  শিক্ষা প্রচলিত ।  ইংরেজি মাধ্যম আন্তর্জাতিক শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হয় ।  ঢাকায় অবস্থিত ব্রিটিশ কাউন্সিলে  “ও লেভেল “ ও “এ লেভেল “ পরীক্ষা হয় ।  আর মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মাদ্রাসা  শিক্ষা পরিচালিত  হয় ।  এই দুই ধারার পার্থক্য curriculum design  এর বিষয়গত অগ্রাধিকারের মাঝে নিহিত, যেখানে জাতীয় মূলধারায় মাদ্রাসা শিক্ষাকে ধর্মীয় মূলধারার সাথে চিহ্ণিত  করা হয়েছে ।

মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মূলধারার শিক্ষার্থীদের মতো মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষায় অংশ নিতে হয় , যা যথাক্রমে দাখিল ও আলিম পরীক্ষা নামে পরিচিত ।  2010 সালে  BANBEIS এর জরীপে দেখা যায় দাখিল মাদ্রাসার ছাত্র সংখ্যা ১২ লক্ষ্য ৬৬ হাজার ২৫৫ জন, যা সামাজিক কাঠামো পরিবর্তনে বিশ্লেষকের ক্ষেত্রে অগ্রাহ্য হতে পারে  ।

বাংলাদেশের বর্তমান মাদ্রাসার উৎস ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা, যার উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারী কাজে  তাদের নিয়োগ করার মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণ শাসনবাবস্থা টিকিয়ে রাখা যা দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতির  ক্ষেত্রে  ফলপ্রসূ ছিল ।  মূলত মুসলমানদের শিক্ষা প্রদান ও তাদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, একই সাথে সমগ্র ভারতকে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আনা এবং দীর্ঘকাল ধরে ভারত শাসন ই ছিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পেছনে ব্রিটিশ সরকারের মূল উদ্দেশ্য ।

সরকারি মাদ্রাসার পাশাপাশি বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তানে কৌমি ও খারিজী মাদ্রাসার অবস্থান লক্ষণীয় যার অর্থায়ন করে থাকে সম্পদশালী মুসলিম রাষ্ট্র ।

ভারতীয় শিক্ষা ব্যাবস্থায় ইংরেজির উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করায় মাদ্রাসা শিক্ষায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়, তা ছিল ফার্সি বাদ দিয়ে ইংরেজি বাধ্যতামূলক করা ।  সে সময়ে সিলেবাসে বাংলা, গণিত, ভূগোল, ইতিহাস সহ বিভিন্ন বিষয় যুক্ত হয় ।  দেশ বিভাজনের পর কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসা ঢাকায় স্থানান্তরিত হয় ।

বাংলাদেশের প্রথম ১৯৮৫ সালে দাখিল পরীক্ষা ১৯৮৭ সালে আলিম পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ।  1978 সালে দেশে কওমি মাদ্রাসা বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয় যার ডিগ্রি রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত নয় ।  1999 সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যাবস্থায় পরিবর্তনের উদ্যোগ  নেয় এবং 2000 সালে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড দাখিল পরীক্ষার সিলেবাস পরিবর্তন  করে ।

এই গবেষণায় আলিয়া মাদ্রাসার অধীনস্থ ৪ টি মাদ্রাসা কে গবেষণার আওতায় আনা হয়েছে যার ২ টি ঢাকা শহরের অদূরে অবস্থিত এবং অন্য ২ টি ঢাকা শহরের কেন্দ্রে ।   এখানে ২ জন ছাত্র পাওয়া যায় যারা মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল ও আলিম পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে এবং বর্তমানে তাদের ১ জন ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ও অন্যজন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ছাত্র।  মসজিদ প্রধান মাদ্রাসাগুলো এতিম শিশু ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের বিনামূল্যে সুযোগ সুবিধা, খাদ্য ও শিক্ষা প্রদান করে  থাকে  ।  ঢাকা শহরের কিছু মাদ্রাসা আবাসিক ছাত্রদের ক্লাস ও রাতে থাকার জন্য পৃথক কক্ষের ব্যবস্থা করতে পারেনা  ।  শিক্ষার পরিবেশের গুন্ ও শিক্ষা ব্যাবস্থার মান দুই-ই নির্ভর করে অর্থের উৎস ও অর্থ ব্যবস্থাপনার উপর ।

শুধু পারিবারিক চাপ ও ইচ্ছা ছাত্রদের মূলধারার শিক্ষা গ্রহনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যার জন্য তারা বাধ্য হয়ে মাদ্রাসায় যায় । এছাড়া স্বল্প আয়ের পরিবারে অভিভাবকরা সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা দিতে বেশি আগ্রহী থাকে  ।  একই সাথে দেখা গিয়েছে এই সব পরিবারে যারা আয় করে তাদের বেশির ভাগই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ, খুব কম সংখ্যক স্নাতক পাশ করেছে ।

মাদ্রাসার ছাত্রদের ভাষ্যমতে তারা ধর্মীয় শিক্ষার অংশ হতে পেরে খুবই আনন্দিত, একই সাথে তারা মনে করে একজন মুসলিম হিসেবে অবশ্যই সঠিকভাবে কোরআন শরীফ ও সূরা জানা উচিত । এটাও দেখা গেছে যে তারা সে সব পত্রিকা পড়তে আগ্রহী যাদের সম্পাদক ইসলামী গ্রুপ এর পক্ষে ও অসাম্প্রদায়িকতার সমালোচক  ।

মাদ্রাসার ছাত্ররা নারী অধিকার ও নারী সমতার বিরোধী, তারা হেফাজত- ই – ইসলাম এর ১৩ দফা দাবি সমর্থন করে যা নারীর সমান অধিকার নীতির বিরুদ্ধে ছিল । মাদ্রাসার ছাত্ররা কঠিন নিয়ম নীতি, যেমন পোশাক- আশাক, দৈনিক কাজ প্রভৃতি ক্ষেত্রে এ নিয়ম ছাত্রদের জন্য খুব কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে  ।  যার কারণে তারা দাখিল পরীক্ষা শেষে সাধারণ কলেজে পড়ার আগ্রহ প্রকাশ করে  ।   তাদের কোন খেলাধুলা বা অন্যান্য কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে না ।  লক্ষণীয় বিষয় এই যে, মাদ্রাসার ছাত্রদের উপর নিষ্ঠুর নির্যাতন করা হয়, বিশেষত শারীরিক নির্যাতন ।  এখানে মেয়েরা লেখাপড়ার ক্ষেত্রে ছেলেদের সমান সুযোগ পায় না ।

মাদ্রাসার ছাত্ররা খেলাধুলা, বিনোদন, টিভি দেখা, গান শোনা সহ বিভিন্ন বিষয় থেকে বিরত থাকে যা তাদের জন্য হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়  ।  গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তারা বাংলা- ইংরেজীকে মূলধারার শিক্ষা থেকে কম গুরুত্ব দেয় । ফলে তারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ভালো করতে পারে না, অনেক ক্ষেত্রে  অবহেলিত হয় ।  তারা মনে  করে ধর্মীয় শিক্ষা তারা সবচেয়ে বেশি পেয়েছে সুতরাং তাদের আগে  priority দেয়া উচিত ।  এবং তারা ধারণা করে যে ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্ররা ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানে না আর বাংলা মাধ্যমের ছাত্ররা যা জানে তা ভুল তাই মাদ্রাসার ছাত্রদের যে কোনো ক্ষেত্রে আগে  allow  করা উচিত  ।     মাদ্রাসার ছাত্রদের নির্যাতন করা হয়, তাদের শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়,অকথ্য ভাষায় গালি দেয়া হয়, মোটা বেত দিয়ে পিটানো হয় ।   যেখানে 2010 সালে অগাস্ট মাসে হাইকোর্টের নির্দেশনা মতে স্কুল ছাত্রদের শারীরিক শাস্তি প্রদান নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও মাদ্রাসার ছাত্রদের মারধর করা হয় ।  1  জন ছাত্রের সাথে কোনো উদ্দেশমূলক ব্যবহার সামাজিক অপকর্মকে নির্বিচারে প্রশ্রয় দিয়ে থাকে যা সমাজের জন্য ক্ষতিকারক  ।  মাদ্রাসায় জাতীয় সংগীত কে অবহেলা করা হয় । বাংলাদেশের ইসলামী সংগঠন জামাত ই ইসলাম ও তার ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবির কে জঙ্গি সংগঠনগুলোকে সহায়তা করার জন্য দায়ী করা হয় । মাদ্রাসাকে  কখনো  “গণ শিক্ষার অস্ত্র “  বা “বৈশ্বিক জিহাদের কারখানা ” হিসেবে গণ্য করা হয় ।    মাদ্রাসা ছাত্রদের নারী অধিকার বিরোধী আন্দোলন এবং একই সাথে তাদের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, মাদ্রাসা ঘৃণা ও  মতাদর্শগত চরমপন্থার শিক্ষা দিয়ে থাকে ।    মাদ্রাসার ছাত্ররা হুজুর বা কর্মচারীদের কর্তৃক যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে, যা ধর্মের অপব্যবহার ।  কিন্তু এই বিষয়টি গোপন থেকে যায়, কেউ ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলে না ।   যে ছাত্র নির্যাতনের শিকার হয় সে তার অভিভাবকের নিকট এই কথা বললেও তারা সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না বরং তাদের বলা হয় এই কষ্ট সহ্য  করলে ধর্মের পথ সহজ হবে । যার ফলে ছাত্ররা হতাশ হয়ে পরে এবং অনেক কেত্রে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয় ।  মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের  শিকার ছাত্ররা Gilman  নামে পরিচিত যার অর্থ ‘দাস ‘। এই বিষয়টি পরিচিত বাচ্চা বাজি নাম যার শুরু হয়ে ছিল মুঘল আমলে ।  সে আমলে যুদ্ধের সময় দেশ যখন অটোম্যান, পার্সিয়ান বা মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে তখন তাদের সৈনিকদের মনোরঞ্জনের জন্য অল্প বয়সী ছেলেদের পাঠানো হতো ।  এশিয়ায়  এর প্রচলন রয়েছে  ।   পাকিস্তান ও বাংলাদেশে মাদ্রাসায় মাওলানা কর্তৃক এই কাজ ঘটিত হয় ।

গ্রামের মানুষ ধর্মীয় মতাদর্শে বিশ্বাসী হওয়ায় এবং শহরের স্বল্প আয়ের মানুষেরা তাদের সন্তানদের কম খরচে শিক্ষা প্রদানে আগ্রহী হওয়ায় তারা সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠায় ।  অনেকে সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাদের মাদ্রাসায় পাঠায়, যেখানে মাদ্রাসায় নিরাপত্তার অভাব, কিন্তু তা অনেকের নিকট অজানা ।  মাদ্রাসার ছাত্রদের যৌন নির্যাতনের মতো ব্যবহার ছাত্রদের মনে অসম্মান ও ঘৃণার উৎপত্তি করে । সীমাবদ্ধ জীবনযাপন করা সত্ত্বেও মাদ্রাসার ছাত্ররা নিজের মধ্যে অন্য ধরণের পরিচয় গড়ে তুলে  ।  অনেকে ধর্মীয় বিশ্বাসে বড় হয়ে ভিন্ন ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে পছন্দ করে  ।

জামাত ই ইসলাম মাদ্রাসার ছাত্রদের দ্বারা ছাত্র শিবির গঠন করতে আগ্রহী যা তরুন সমাজ ধ্বংস করার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখে । এই ধরণের চরমপন্থী ও স্বেচ্ছাচারিতা থামানোর জন্য মাদ্রাসার ছাত্রদের রাজনীতিতে যোগদান বন্ধ করতে হবে এবং তাদের সাথে অন্যায় ও নিপীড়ন বন্ধের জন্য  উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে  ।

Please follow and like us:
Download PDF

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here